প্রযুক্তি দুনিয়ায় এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের চিন্তা ও কাজ পুরো পৃথিবীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। তাঁদেরই একজন স্টিভ জবস। ব্যক্তিগত কম্পিউটার থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র কিংবা সংগীত শোনার অভ্যাস, সবকিছুতেই তিনি এনে দিয়েছেন আমূল পরিবর্তন। এক আইরিশ সংগীতশিল্পী একবার মন্তব্য করেছিলেন, একবিংশ শতাব্দী তৈরি হয়েছে এমন কিছু ব্যতিক্রমী মানুষের হাত ধরে, যারা ভিন্নভাবে চিন্তা করতে জানতেন। সেই তালিকার অন্যতম ছিলেন এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।
মাত্র ২০ বছর বয়সে কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এক বিপ্লব। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন এই প্রযুক্তি পথিকৃৎ, আরেকজন সফটওয়্যার জগতের আরেক কিংবদন্তি। দুজনের কাজই প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের নাগালে এনে দিয়েছে এবং নতুন যুগের সূচনা করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি নিজে প্রচলিত অর্থে প্রযুক্তিবিদ ছিলেন না এবং কলেজের পড়াশোনাও শেষ করেননি। তবুও তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক জগৎ, যা আজকের ডিজিটাল সভ্যতার ভিত্তি।
২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া তাঁর বক্তৃতা আজও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বক্তৃতাগুলোর একটি। সেখানে তিনি নিজের জীবনের তিনটি গল্প শোনান। প্রথম গল্প ছিল জীবনের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো কীভাবে একসময় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কলেজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত, ক্যালিগ্রাফি শেখা, এসব তখন অর্থহীন মনে হলেও পরবর্তীতে তা ব্যক্তিগত কম্পিউটারের নকশায় বিপ্লব ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় গল্পে উঠে আসে তাঁর জীবনের উত্থান-পতন। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে একসময় তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনা ছিল তাঁর জীবনের বড় ধাক্কা। তবে পরে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এই ঘটনাই তাঁকে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি নতুন কোম্পানি গড়ে তোলেন, অ্যানিমেশন জগতে বিপ্লব ঘটান এবং পরে আবার নিজের প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তনই প্রতিষ্ঠানের পুনর্জাগরণের মূল শক্তি হয়ে ওঠে।
তাঁর নেতৃত্বে প্রযুক্তি বিশ্বে একের পর এক পরিবর্তন আসে। ব্যক্তিগত কম্পিউটারকে জনপ্রিয় করে তোলা, গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসের ব্যবহার সহজ করা, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন, সংগীত শোনার ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা এবং স্মার্টফোনকে বহুমাত্রিক ডিভাইসে রূপান্তর, এসবই তাঁর অবদানের অংশ। শুধু প্রযুক্তি নয়, ডিজাইন ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকেও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। জন্মের পরই তিনি দত্তক হিসেবে অন্য পরিবারে বড় হন। পরবর্তী সময়ে নিজের জৈবিক পরিবারের খোঁজ পান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে সম্পর্কের উত্থান-পতনও তাঁকে প্রভাবিত করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি একটি স্থিতিশীল পারিবারিক জীবনে পৌঁছান।
আধ্যাত্মিকতার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তরুণ বয়সে ভারত ভ্রমণ, ধ্যানচর্চা এবং জীবনদর্শনের অনুসন্ধান তাঁর চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়, যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্প ও সরলতার মেলবন্ধন দেখা যায়।
কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও খুঁতখুঁতে। সহকর্মীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের কাজ প্রত্যাশা করতেন। তাঁর সরাসরি মন্তব্য অনেক সময় কঠোর মনে হলেও, এর লক্ষ্য ছিল সেরা ফলাফল নিশ্চিত করা। এই কঠোরতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি মৃত্যু নিয়েও কথা বলেছেন খোলামেলাভাবে। তাঁর মতে, মৃত্যুর কথা মনে রাখা মানুষের জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কারণ এতে অহংকার, ভয় বা সামাজিক চাপের প্রভাব কমে যায় এবং মানুষ সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া কাজ, চিন্তা ও দর্শন এখনো প্রযুক্তি বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, ভিন্নভাবে ভাবার সাহস থাকলে একজন মানুষ পুরো পৃথিবীকেই বদলে দিতে পারেন।





Add comment