সোনার দামে বড় ধস, বদলাচ্ছে হিসাব

বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই নিম্নমুখী হয়েছে সোনার দাম। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মূল্যবান এই ধাতুর দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি কমেছে ৪৩৪ ডলার ৪৫ সেন্ট। এর ধারাবাহিকতায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

গত সপ্তাহেই বিশ্ববাজারে সোনার দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাঁচ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে। একপর্যায়ে তা আরও বেড়ে পাঁচ হাজার ৫০০ ডলারের ঘরেও প্রবেশ করে। তবে সেই ঊর্ধ্বগতির ধারা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে বিশ্ববাজারে সোনার দাম নেমে এসেছে আউন্সপ্রতি চার হাজার ৮৯৩ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি আউন্সে ছয় শতাধিক ডলার কমেছে দাম।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়ার পর থেকেই সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়। যদিও বৈশ্বিক অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি, তবু অনিশ্চয়তা কিছুটা কমায় বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে। এর ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহ সাময়িকভাবে হ্রাস পায়। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনো সোনার দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অবস্থানে রয়েছে।

গত সপ্তাহে সোনার দাম দ্রুত বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। তখন আশঙ্কা তৈরি হয়, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট এমন কাউকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন, যিনি রাজনৈতিক চাপের মুখে সুদের হার কমানোর পথে হাঁটবেন। এতে ডলারের মান দুর্বল হয়ে পড়া এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এসব ঝুঁকি এড়াতে বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝুঁকেছিলেন।

পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশ মনোনয়ন পেতে পারেন এমন খবর সামনে আসার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় তাঁকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও স্থিতিশীল সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করছেন বিনিয়োগকারীরা। এই খবরে বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে এবং একযোগে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের দাম কমতে শুরু করে।

তবে সাম্প্রতিক দরপতন সত্ত্বেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান ধাতুগুলোর আকর্ষণ পুরোপুরি কমে যায়নি। চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশে শুল্ক আরোপের আশঙ্কা এবং বিশ্বজুড়ে সংঘাতের পরিবেশ এখনো বিনিয়োগকারীদের সতর্ক রাখছে। এসব কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে সোনা ও রুপার গুরুত্ব এখনো অটুট রয়েছে।

এবিসি রিফাইনারির ইনস্টিটিউশনাল মার্কেটস বিভাগের বৈশ্বিক প্রধানের মতে, সোনা কোনো নির্দিষ্ট দেশের ঋণ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি এমন একটি সম্পদ, যা অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সাম্প্রতিক পতন আবারও প্রমাণ করেছে, সোনাসহ সব পণ্যের দাম যেমন দ্রুত বাড়তে পারে, তেমনি দ্রুত কমেও যেতে পারে।

বিশ্বে সোনার সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এর প্রতি মানুষের আগ্রহ বরাবরই বেশি। বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পৃথিবীতে মোট প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। এই পরিমাণ সোনা দিয়ে তিন থেকে চারটি অলিম্পিক মানের সুইমিংপুল ভরানো সম্ভব। এর একটি বড় অংশই ১৯৫০ সালের পর উত্তোলিত হয়েছে, যখন খনন প্রযুক্তির উন্নতি ঘটে এবং নতুন সোনার ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য বলছে, ভূগর্ভে এখনো প্রায় ৬৪ হাজার টন সোনার মজুত থাকতে পারে। তবে আগামী কয়েক বছরে সোনার সরবরাহের গতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সোনার দামে আবারও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববাজারের দরপতনের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। শুক্রবার ভরিপ্রতি সোনার দাম কমেছে ১৪ হাজার ৬৩৮ টাকা। আজ শনিবার বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি নতুন করে দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। ঘোষণায় জানানো হয়, প্রতি ভরিতে দাম কমেছে ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা। এতে ২২ ক্যারেট মানের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা।

একই সঙ্গে ২১ ক্যারেট ও ১৮ ক্যারেট সোনার দামও কমানো হয়েছে। ২১ ক্যারেট সোনার দাম ভরিপ্রতি কমেছে ১৪ হাজার ৯৮৮ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দাম কমেছে ১২ হাজার ৮৮৮ টাকা। ফলে ২১ ক্যারেটের দাম হয়েছে দুই লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দাম দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা। সনাতন পদ্ধতির সোনার দামও কমে ভরিপ্রতি এক লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকায় নেমে এসেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed