প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর আর নেই। আজ শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল পিয়ারলেসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে অসংখ্য পাঠকপ্রিয় ও কালজয়ী রচনার স্রষ্টা এই লেখকের প্রয়াণে কলকাতার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত যশোর জেলার বনগ্রাম বা বনগাঁয় তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে কলকাতার পাশের হাওড়ায়। সেখান থেকেই জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, মানুষের সংগ্রাম ও সমাজবাস্তবতার প্রতি তাঁর গভীর দৃষ্টি তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে সাহিত্যে শক্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই সাহিত্যিক। তিনি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। গত ডিসেম্বর মাসে বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান এবং হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও প্রায় ১৫ দিন আগে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাঁকে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ দুপুরে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ, জনঅরণ্য, কত অজানারে, চরণ ছুঁয়ে যাই, বিবেকানন্দ, অচেনা অজানা, দ্বিতীয় পুরুষ, মণিহার এবং পিকলুর কলকাতা ভ্রমণ। তাঁর একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ ও জনঅরণ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। একসময় কলকাতার শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারি চাকরিতেও যুক্ত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক ও বিশিষ্টজনেরা। মুখ্যমন্ত্রী এক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, বাংলা সাহিত্য আজ একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হারাল। চৌরঙ্গী থেকে কত অজানারে কিংবা সীমাবদ্ধ থেকে জনঅরণ্য, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখায় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, আশা, বেদনা ও বাস্তবতার বহুমাত্রিক রূপ উঠে এসেছে বলেও শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়।
মৃত্যুর আগে নিজের শেষ ইচ্ছার কথাও জানিয়ে গিয়েছিলেন এই সাহিত্যিক। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন কোনো শোকমিছিল না হয়। হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ সরাসরি কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে গিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকেও সেই ইচ্ছা পূরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি কলকাতার বালিগঞ্জের বন্ডেল রোডে বসবাস করতেন। তাঁর স্ত্রী বহু আগেই প্রয়াত হয়েছেন। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছেন, দুজনই বর্তমানে বিদেশে বসবাস করছেন। ব্যক্তিজীবনে সংযত ও সৃষ্টিশীল এই সাহিত্যিক তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে এক অধ্যায়ের অবসান হলেও সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল।







Add comment