মানব সভ্যতার ইতিহাসে আশ্রয়ের সন্ধান একটি চিরন্তন বাস্তবতা। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যেমন দিনের শেষে নিরাপদে থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করেছিল, তেমনি সেইসব প্রাচীন বসতির কিছু এখনো পৃথিবীর বুকে অটুটভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের প্রবল স্রোত পেরিয়েও টিকে থাকা এসব স্থাপনা মানব ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পিরামিডগুলোর একটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৭ শতকে মিসরের সাক্কারা মরুভূমিতে। ইতিহাসের প্রথম দিকের স্থপতিদের একজন ফারাওয়ের নির্দেশনায় এমন এক স্থাপনা নির্মাণের ধারণা দেন, যেখানে মৃতদেহ মাটির নিচে নয়, বরং আকাশমুখী পাথরের স্তরে সংরক্ষণ করা হবে। এভাবেই নির্মিত হয় ‘স্টেপ পিরামিড’, যা ছয়টি ধাপে গঠিত এবং উচ্চতায় প্রায় ৬২ মিটার। এই পিরামিডের ভেতরে রয়েছে বিস্তৃত সমাধিচত্বর, মন্দির, আঙিনা এবং বিভিন্ন হলওয়ে। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এটি আজও অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন বসতির সন্ধান পাওয়া যায় পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের বলান উপত্যকায় অবস্থিত মেহেরগড়ে। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৭ হাজার থেকে ২ হাজার ৬০০ অব্দ পর্যন্ত এখানে মানুষের বসবাস ছিল। কাদা ও ইট দিয়ে নির্মিত ছাদবিহীন চার দেয়ালের ছোট ছোট ঘরগুলো সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য নির্মিত এই ঘরগুলো সময়ের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। মেহেরগড়কে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম বসতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রস্তর যুগের আরেকটি বিস্ময়কর নিদর্শন দেখা যায় যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জে। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলের একটি ছোট দ্বীপে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম অক্ষত বাড়িগুলোর মধ্যে দুটি। ‘ন্যাপ অব হোয়ার’ নামে পরিচিত এই ঘরগুলোর নির্মাণকাল ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০০ থেকে ৩৫০০ অব্দের মধ্যে। পাথরের ওপর পাথর বসিয়ে তৈরি করা এই স্থাপনাগুলো এখনো দৃঢ়ভাবে টিকে আছে, যা প্রাচীন নির্মাণশৈলীর উৎকর্ষতা তুলে ধরে।
এছাড়া অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের মেইনল্যান্ড দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত স্কারা ব্রে নামের একটি প্রাচীন বসতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বে অব স্কাইল এলাকায় অবস্থিত এই বসতিতে রয়েছে প্রায় ১০টি পাথরের ঘর, যার নির্মাণকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৮০ থেকে ২৫০০ অব্দের মধ্যে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে মানুষ বসবাস করত। এই ঘরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত এবং ভেতরে রয়েছে পাথরের তৈরি বিছানা, তাকসহ প্রয়োজনীয় আসবাবের চিহ্ন। ধারণা করা হয়, এই বসতিতে মূলত কৃষকেরা বসবাস করতেন।
পাথরের মজবুত কাঠামো এবং প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহারের কারণে এসব প্রাচীন বসতি হাজার বছরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজও অটুট রয়েছে। বর্তমানে এগুলো শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বই বহন করছে না, বরং পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
সময়ের সাথে সাথে সভ্যতার পরিবর্তন হলেও মানুষের বাসস্থান নির্মাণের এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে, টেকসই স্থাপত্যের ধারণা বহু আগেই বিকশিত হয়েছিল। হাজার বছরের পুরোনো এসব বসতি আজও মানব ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।





Add comment