বিশ্ব অর্থনীতির বিস্তার এবং বৈশ্বিক বাজারের সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আকার ও সম্পদ। একসময় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলেও সেই বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহু আগে শুরু হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত ও চীনের বিপুল জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে গত চার দশকে এই অগ্রগতি দ্রুততর হয়েছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তারের ফলে বিশ্ববাজারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন খাতে অসংখ্য কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা মানুষের নানামুখী চাহিদা পূরণে কাজ করছে। প্রতিবছর বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করপোরেট সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে। কোম্পানির মোট সম্পদের মধ্যে থাকে চলতি ও অচল সম্পদের সমষ্টি, যেমন মজুত পণ্য, নগদ অর্থ, নগদ সমতুল্য সম্পদ, স্থাবর সম্পত্তি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম।
গত কয়েক দশকে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক করপোরেট তালিকায়। সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখন চীনের। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোরও শক্ত অবস্থান রয়েছে।
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এইচএসবিসি, যার মোট সম্পদ ৩ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৮৬৫ সালে হংকংয়ে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় বর্তমানে লন্ডনে। বিশ্বের ৬২টি দেশে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ গ্রাহককে সেবা দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। খুচরা ব্যাংকিং, করপোরেট ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ব্যাংকিং, সম্পদ ও ধনসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এর কার্যক্রম বিস্তৃত।
নবম স্থানে থাকা ফ্রান্সভিত্তিক বিএনপি পারিবাসের সম্পদ ৩ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ৬৪টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এই গ্রুপে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ। খুচরা ও করপোরেট ব্যাংকিং থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইউরোপীয় অর্থনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অষ্টম স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অব আমেরিকা, যার সম্পদ ৩ দশমিক ৪০৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বহুজাতিক ব্যাংক বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৩ হাজার ৬০০ শাখা পরিচালনা করছে।
সপ্তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল হোম লোন মর্টগেজ করপোরেশন বা ফ্রেডি ম্যাক। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা সরাসরি ঋণ প্রদান না করে ব্যাংক ও ঋণদাতাদের কাছ থেকে মর্টগেজ কিনে সিকিউরিটিতে রূপান্তর করে। এর সম্পদ ৩ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার। আবাসন খাতে তারল্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠ স্থানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ফেডারেল ন্যাশনাল মর্টগেজ অ্যাসোসিয়েশন বা ফ্যানি মে, যার সম্পদ ৪ দশমিক ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার। বন্ধকি ঋণকে সিকিউরিটিতে রূপান্তরের মাধ্যমে আবাসন খাতে তারল্য বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য।
পঞ্চম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেপি মরগ্যান অ্যান্ড চেজ, যার সম্পদ ৪ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার। নিউ ইয়র্ককেন্দ্রিক এই প্রতিষ্ঠানটি ১০০টির বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্যও পরিচিত।
চতুর্থ স্থানে চীনের ব্যাংক অব চায়না, যার সম্পদ ৫ দশমিক ২৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নে বিশেষজ্ঞ। বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে এর ৬০০-এর বেশি শাখা রয়েছে।
তৃতীয় স্থানে চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক, যার সম্পদ ৬ দশমিক ২০ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১৩ হাজার ৬০০টি এবং বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে এর উপস্থিতি রয়েছে।
দ্বিতীয় স্থানে অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংক অব চায়না, যার মোট সম্পদ ৬ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের ২৩ হাজার ৭০০-এর বেশি শাখা রয়েছে। গত এক বছরে এর সম্পদ বেড়েছে ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীনের আইসিবিসি, যার সম্পদ ৭ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশের ভেতরে ১৬ হাজার এবং বিদেশে চার শতাধিক শাখা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৭২ কোটি এবং করপোরেট গ্রাহক ১ কোটি ৭০ লাখ। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।







Add comment