মানুষের সৃষ্ট শব্দদূষণ বিশ্বজুড়ে পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলছে। সঙ্গী আকর্ষণের জন্য তাদের গাওয়া গান, খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং শিকারির আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা সব ক্ষেত্রেই ব্যাঘাত ঘটছে। বুধবার প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটির অংশ হিসেবে গবেষকেরা প্রায় চার দশক ধরে প্রকাশিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষের তৈরি শব্দদূষণ ছয়টি মহাদেশে পাখিদের আচরণ ও জীবনচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে তাদের প্রজননক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন এই বিশ্লেষণে ১৯৯০ সাল থেকে প্রকাশিত গবেষণাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে ১৬০ প্রজাতির পাখির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে সংগৃহীত এসব তথ্যের মাধ্যমে গবেষকেরা পাখিদের আচরণগত পরিবর্তনের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে শব্দদূষণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে পাখিদের অস্তিত্বের ওপর প্রভাব ফেলছে।
গবেষণাপত্রটি ‘প্রসিডিংস অব দ্য রয়েল সোসাইটি বি’ সাময়িকীতে বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, শব্দদূষণের প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বব্যাপী পাখিদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, শব্দদূষণের ফলে পাখিদের পারস্পরিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা খাদ্য খোঁজা, শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা এবং নিজেদের শারীরিক অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছে। পাশাপাশি তাদের আবাসস্থল নির্বাচন ও প্রজনন প্রক্রিয়াতেও বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
পাখিরা টিকে থাকার জন্য শব্দের মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদানের ওপর নির্ভরশীল। মিলনের জন্য সঙ্গীকে আকৃষ্ট করা, বিপদের সংকেত দেওয়া কিংবা ছানাদের খাদ্যের প্রয়োজন জানানো সব ক্ষেত্রেই শব্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে যানবাহনের আওয়াজ, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ এবং নগর জীবনের ক্রমবর্ধমান কোলাহল তাদের জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন নাতালি ম্যাডেন। তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, পাখিরা সঙ্গী আকর্ষণে গান গায়, শিকারি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিতে বিশেষ ডাক ব্যবহার করে এবং ছানারা ক্ষুধার সংকেত দিতে আলাদা শব্দ করে থাকে। এসব সংকেত তাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা দলের প্রধান আরও বলেন, চারপাশে অতিরিক্ত শব্দ থাকলে পাখিদের নিজেদের প্রজাতির সংকেত সঠিকভাবে শোনা সম্ভব হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ শব্দদূষণ তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে পুরুষ পাখিরা সঙ্গী আকর্ষণের গান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার কোথাও মা পাখি ও ছানার মধ্যকার যোগাযোগের শব্দ বাইরের কোলাহলে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রজনন ও বংশবিস্তারের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার সার্বিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষের তৈরি শব্দদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি বন্যপ্রাণীর আচরণ ও টিকে থাকার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা না হলে ভবিষ্যতে পাখিদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের ওপর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে







Add comment