বছরের শুরু এলেই চাকরিজীবীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, এ বছর বেতন কতটা বাড়তে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে পেশা ও দক্ষতার ওপর। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক কাজগুলোতে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ২০২৬ সাল হতে পারে উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধির বছর। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিজিউমে জিনিয়াস’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
যদিও এই গবেষণাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে তৈরি, তবে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের বর্তমান ধারা বিবেচনায় নিলে এর গুরুত্ব শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট জব, আউটসোর্সিং এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এই যুগে বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্যও এই তথ্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সাধারণ দক্ষতার চেয়ে বিশেষায়িত দক্ষতার মূল্য এখন অনেক বেশি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ক্যারিয়ার বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে দক্ষ জনবলের চাহিদা বেশি, সেখানেই বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেশি। বিশেষ করে যেসব শিল্প খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, সেখানে কর্মরত দক্ষ পেশাজীবীরা ২০২৬ সালে বেতন বৃদ্ধির দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।
গবেষণায় যে ১০টি পেশাকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে আর্থিক ব্যবস্থাপক। জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার চাপে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দক্ষ অর্থ ব্যবস্থাপকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে এই পেশার চাহিদা বরাবরই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক হিসাবে এই পেশায় বার্ষিক গড় বেতন প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৭০০ ডলার।
ডিজিটাল যুগে মার্কেটিং ম্যানেজারের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গ্রাহক আচরণ বিশ্লেষণ এবং ডেটাভিত্তিক কৌশল নির্ধারণে যাঁরা দক্ষ, তাঁদের কদর দ্রুত বাড়ছে। ফ্রিল্যান্সিং বাজারেও ডিজিটাল মার্কেটিং এখন অন্যতম শীর্ষ আয়ের ক্ষেত্র। এই পেশায় বৈশ্বিক গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ডলার।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক। অনলাইন কার্যক্রম যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি। এই কারণে তথ্য সুরক্ষায় দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকে এই খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে এই পেশায় গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ডলার।
ডেটা সায়েন্টিস্ট পেশাটিও ২০২৬ সালে বেতন বৃদ্ধির দৌড়ে শক্ত অবস্থানে থাকবে। তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবসার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দিতে পারেন এমন পেশাজীবীদের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। বাংলাদেশের আইটি খাতের তরুণদের জন্য এটি একটি বড় সম্ভাবনার জায়গা। এই পেশায় বৈশ্বিক গড় বেতন প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ডলার।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের মধ্যে নিবন্ধিত নার্সদের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই উঁচু। উন্নত দেশগুলোতে নার্স সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে বিদেশে কাজের সুযোগের পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাড়ছে। এই পেশায় বার্ষিক গড় আয় প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০ ডলার।
কারিগরি পেশার তালিকায় রয়েছে বিদ্যুৎ লাইন মেরামতকারী। উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়াও হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন করে যে ভালো আয় সম্ভব, এই পেশা তার স্পষ্ট উদাহরণ। বৈশ্বিক হিসাবে এই পেশায় গড় বেতন প্রায় ৯২ হাজার ডলার।
উড়োজাহাজ মেকানিকদের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। আকাশপথে যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ মেকানিক ছাড়া এভিয়েশন খাত সচল রাখা সম্ভব নয়। এই পেশায় গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ৭৮ হাজার ডলার।
সহকারী নার্সদের ক্ষেত্রেও বেতন বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। মূল নার্সদের সহায়তায় কাজ করা এই পেশাজীবীদের আয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক গড় বেতন প্রায় ৬২ হাজার ডলার।
অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারী যন্ত্রপাতির অপারেটরদের চাহিদা শ্রমবাজারে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়া তুলনামূলক সহজ। এই পেশায় গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৫৮ হাজার ডলার।
সবশেষে রয়েছে ট্রাকচালক। সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে দক্ষ চালকের প্রয়োজনীয়তা কখনোই কমে না। উন্নত দেশগুলোতে অভিজ্ঞ চালকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতনের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এই পেশায় বৈশ্বিক গড় বেতন প্রায় ৫৭ হাজার ডলার।
গবেষণাটি থেকে স্পষ্ট, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক পেশাগুলোই আগামী দিনে শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যাঁদের এই ধরনের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে, তাঁরা ২০২৬ সালজুড়ে বেতন বাড়ানোর আলোচনায় শক্ত অবস্থানে থাকবেন। ক্যারিয়ার পরিবর্তন বা নতুন দক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনায় এই পেশাগুলো হতে পারে বাস্তবসম্মত ও লাভজনক লক্ষ্য।







Add comment