শিশুদের মধ্যে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেক সময় অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন না কেন তাদের সন্তানের শরীরে এই সমস্যা দেখা দিল বা কীভাবে এটি তৈরি হলো। শিশুদের অ্যানিমিয়ার পেছনে বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে এবং সঠিকভাবে কারণ নির্ণয় করা না গেলে সমস্যাটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
শিশুদের অ্যানিমিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ অপুষ্টি। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের খাবারের বিষয়ে অভিভাবকদের ভুল ধারণার কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আয়রন, ফলিক অ্যাসিড এবং কপারসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের অভাব থাকলে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিও কখনো কখনো এই সমস্যার জন্য দায়ী হয়।
অনেক পরিবারে এক বছরের বেশি বয়সী শিশুকে দিনে কয়েকবার শুধু দুধ খাওয়ানো হয়। অনেক সময় ৩ থেকে ৪ বার বা তারও বেশি দুধ খাওয়ানো হলেও মাছ, ভাত বা সবজি জাতীয় অন্যান্য খাবার দেওয়া হয় না। এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ দুধে রক্ত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিশুর শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অকাল জন্মগ্রহণ করা বা কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। একইভাবে যমজ শিশুদের শরীরেও জন্মের সময় আয়রনের সঞ্চয় কম থাকতে পারে। এর ফলে জন্মের কিছুদিন পর থেকেই এসব শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হয়ে অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে। দেহে রক্তকণিকা উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও হিমোগ্লোবিন তৈরির উপাদান কম থাকায় এক ধরনের ‘ডিসহিমোপয়েটিক অ্যানিমিয়া’ শুরু হয়।
শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণও অ্যানিমিয়ার একটি বড় কারণ। এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘হেমোরেজিক অ্যানিমিয়া’। শিশুরা যদি খোলা জায়গায় খালি পায়ে হাঁটে, তখন হুককৃমি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। একটি হুককৃমি প্রতিদিন প্রায় ০.১ থেকে ০.৫ সিসি পর্যন্ত রক্ত শোষণ করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রমণ থাকলে শিশুর শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এছাড়া গোলকৃমি বা অন্যান্য অন্ত্রের সংক্রমণ এবং দীর্ঘদিন পেটের অসুখ থাকলেও শিশুর অ্যানিমিয়া হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে আঘাতজনিত কারণে অতিরিক্ত রক্তপাত, বড় ধরনের আগুনে পোড়া, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি বা রক্তমিশ্রিত পায়খানার মতো পরিস্থিতিতেও অ্যানিমিয়া তৈরি হতে পারে। মলদ্বারে পলিপের কারণে দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ হলেও একই সমস্যা দেখা দেয়। আবার রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যাজনিত রোগ যেমন হিমোফেলিয়াও শিশুদের অ্যানিমিয়ার লক্ষণ তৈরি করতে পারে।
আরেক ধরনের অ্যানিমিয়া হলো ‘হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া’। এই অবস্থায় শরীরে তৈরি হওয়া রক্তকোষ খুব দ্রুত ভেঙে যায়। শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে অনেক সময় তা শনাক্ত করতে দেরি হয়, যার ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি, সেখানে মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেও অ্যানিমিয়ার হার বেশি দেখা যায়। আবার থ্যালাসেমিয়া বা ব্লাড ক্যানসারের মতো রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও অনেক সময় অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে।
এছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও শিশুদের রক্তশূন্যতা হতে পারে। এসব ওষুধ কখনো কখনো হাড়ের মজ্জাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেখান থেকে শরীরে রক্ত তৈরি হয়। ফলে ধীরে ধীরে রক্ত উৎপাদন কমে গিয়ে অ্যানিমিয়া তৈরি হয়।
এই সমস্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যানিমিয়ার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া। শিশুদের নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন, যাতে কৃমিজনিত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কমে।
যদি কোনো শিশুর মারাত্মক অ্যানিমিয়া ধরা পড়ে, তখন প্রয়োজন হলে রক্তের উপাদান পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে কেবল লোহিত রক্তকণিকা দেওয়া উচিত।
শিশুর শরীর যদি ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে থাকে, তাহলে দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অ্যানিমিয়ার প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করে নিজ থেকে আয়রন সিরাপ খাওয়ানো ঠিক নয়। বিশেষ করে শিশু যদি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাহলে এ ধরনের ভুল চিকিৎসা গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।





Add comment