চীনের মধ্যাঞ্চলের হেনান প্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক শাওলিন মঠে সম্প্রতি দেখা গেছে এক ব্যতিক্রমী ও নজরকাড়া দৃশ্য। শতাব্দীপ্রাচীন এই বৌদ্ধ মঠে শাওলিন ভিক্ষুদের সঙ্গে কুংফু অনুশীলনে অংশ নিয়েছে একদল মানবসদৃশ রোবট। প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক প্রযুক্তির এমন সম্মিলন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাওলিন মঠে ভিক্ষুদের সঙ্গে রোবটের প্রশিক্ষণের দৃশ্য ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সাড়া পড়ে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, রোবটগুলো ভিক্ষুদের পাশে দাঁড়িয়ে কুংফুর নিয়মিত অনুশীলনে অংশ নিচ্ছে। অনুশীলনের আগে শরীর গরম করার ব্যায়াম থেকে শুরু করে প্রতিদিনের নির্ধারিত প্রশিক্ষণসূচির প্রতিটি ধাপ তারা নিখুঁতভাবে অনুসরণ করছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোর মন্তব্যের ঘরে মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল বৈচিত্র্যময়। অনেকেই এই দৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তা মানুষের দীর্ঘদিনের শারীরিক অনুশীলনকেও অনুকরণ করতে সক্ষম। আবার কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতে মানুষের জীবনে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মানবসদৃশ রোবটগুলো ভিক্ষুদের সঙ্গে মঠ প্রাঙ্গণে চলাফেরা করছে এবং শাওলিন কুংফুর জন্য নির্ধারিত প্রশিক্ষণস্থলে গিয়ে অনুশীলন করছে। কুংফু চর্চার সময় যে শারীরিক ভঙ্গি, শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ এবং নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়, রোবটগুলো সেগুলো অবিকল অনুকরণ করছে। মানুষের শিক্ষার্থীরা যেভাবে তাঁদের গুরুর প্রতিটি নির্দেশ মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করে, রোবটগুলোকেও ঠিক সেভাবেই প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করতে দেখা গেছে।
তবে এই দৃশ্য সবাইকে আনন্দিত করেনি। অনেকের কাছে এটি ছিল এক ধরনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। তাঁদের মতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ কঠোর অনুশাসন, আত্মসংযম, নিয়মিত সাধনা এবং আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে যে শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা অর্জন করেছে, তা এখন যন্ত্রের মাধ্যমে প্রদর্শিত হচ্ছে। এতে মানবিক শ্রম ও সাধনার মূল্য কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
শাওলিন কুংফু কেবল একটি যুদ্ধকলা বা শারীরিক ব্যায়াম নয়। এটি বৌদ্ধ দর্শন, ধ্যান, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্থিতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক অনন্য সাধনাপদ্ধতি। এই ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গুরু থেকে শিষ্যের কাছে হস্তান্তরিত হয়ে এসেছে। তাই অনেকের প্রশ্ন, এমন পবিত্র ও আধ্যাত্মিক স্থানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা গ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে, ভিন্ন মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের এই মিলন ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তাঁদের মতে, রোবট প্রযুক্তির মাধ্যমে শাওলিন কুংফুর শারীরিক কৌশলগুলো সংরক্ষণ ও গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে শাওলিন মঠে ভিক্ষুদের সঙ্গে রোবটের কুংফু চর্চা আধুনিক বিশ্বের এক নতুন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। যেখানে প্রযুক্তি ক্রমেই মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করছে এবং সেই সঙ্গে জন্ম দিচ্ছে প্রশংসা, বিস্ময় ও বিতর্কের।







Add comment