টোকিওতে অনুষ্ঠিত ডেফলিম্পিকসে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার ক্রীড়া উপভোগের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সরাসরি খেলায় উপস্থিত দর্শকদের কাছে পরিবেশের আবহ যেমন দৃশ্য ও গন্ধের মাধ্যমে ধরা দেয়, তেমনি শব্দও বড় একটি অংশ। ব্যাটের আঘাত, বাঁশির তীক্ষ্ণ ধ্বনি, বলের শব্দ কিংবা দর্শকের উল্লাস মিলিয়ে তৈরি হয় সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু যাঁরা শুনতে পান না, তাঁদের জন্য সেই অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতেই এ আয়োজন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ডেফলিম্পিকস বধির ক্রীড়াবিদদের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। এখন এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তির অন্যতম পরীক্ষাগারেও পরিণত হয়েছে। প্রকৌশলী, নকশাবিদ ও বধির ব্যবহারকারীরা একসঙ্গে কাজ করে দেখিয়েছেন, শব্দ শুধু শোনার বিষয় নয়; এটি দেখা যায়, অনুভব করা যায়, এমনকি হাতে ধরেও উপলব্ধি করা যায়।
টেবিল টেনিস ভেন্যুতে এ ধারণার সরল কিন্তু শক্তিশালী প্রয়োগ দেখা গেছে। কোর্টের ওপরে বড় পর্দায় ভেসে উঠেছে অ্যানিমেটেড জাপানি অনোমাটোপোয়িক শব্দ, যা খেলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলের আঘাত, র্যালির গতি ও স্ম্যাশের শক্তিকে দৃশ্যমান করেছে। জাপানি সংস্কৃতিতে অনোমাটোপোয়িয়ার ব্যবহার বহুল পরিচিত, বিশেষত মাঙ্গা ও গণমাধ্যমে। সেই সাংস্কৃতিক উপাদানই এখানে হয়েছে সহজপ্রাপ্যতার হাতিয়ার। নতুন দর্শকদের জন্যও এটি খেলার গতি, পয়েন্টের গুরুত্ব ও ম্যাচের মোড় ঘোরার মুহূর্ত বোঝাতে সহায়ক হয়েছে।
ডেফ টেবিল টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রযুক্তির বিবর্তন তিনি দেখেছেন। তাঁর মতে, খেলোয়াড়েরা সরাসরি ম্যাচ উপভোগ করতে পারলেও, যারা খেলোয়াড় নন বা বধির, তাঁদের জন্য এই ভিজ্যুয়াল পদ্ধতি বোঝাপড়া সহজ করেছে। এমন আয়োজন তাঁকে আবেগাপ্লুত করেছে বলেও জানান তিনি।
টোকিও ও আশপাশের ১৯টি ভেন্যু ঘিরে হাজারো বধির দর্শকের উপস্থিতিতে শহরটি যেন হয়ে উঠেছে প্রযুক্তিগত পরীক্ষার ক্ষেত্র। মেট্রো স্টেশনগুলোতে স্থাপিত স্বচ্ছ শব্দ থেকে টেক্সট অনুবাদ স্ক্রিন ভ্রমণকে করেছে সহজ। জাপানি ভাষা না জানলেও যোগাযোগে সুবিধা মিলেছে।
ডেফলিম্পিকস স্কয়ারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরিবহন ডিসপ্লে বিশেষভাবে নজর কাড়ে। প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা, ট্রেনের আগমন, সতর্কবার্তা কিংবা পটভূমির শব্দ শনাক্ত করে তা টেক্সট ও সাইন ভাষায় রূপান্তর করা হয়। এখানে অনোমাটোপোয়িক উপস্থাপনাও যুক্ত হয়েছে, যাতে জরুরি অবস্থা বা আবেগের মাত্রা বোঝা যায়। এ ডিভাইসটি বধির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নকশা করা হয়েছে, যাতে এটি নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব ও আনন্দদায়ক হয়।
জুডো ভেন্যুতে দর্শকদের হাতে ছিল কম্পন ডিভাইস। মাইক্রোফোন ও সেন্সর ম্যাটের ওপরের নড়াচড়া শনাক্ত করে বিভিন্ন মাত্রার কম্পন পাঠিয়েছে। পায়ের সঞ্চালনে হালকা কম্পন, সংঘর্ষে তীব্র অনুভূতি এবং সম্পূর্ণ থ্রো হলে গভীর স্পন্দন অনুভূত হয়েছে। ম্যাচের শুরু ও শেষের সংকেতও এ ডিভাইস দিয়েছে। এক সাবেক সাঁতারু জানান, ম্যাচ শুরু বা শেষ হওয়ার মুহূর্ত জানা তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এ প্রযুক্তি নিশ্চিত করেছে।
প্রধান নির্বাহী স্বীকার করেছেন, দর্শকের প্রতিক্রিয়ার সূক্ষ্মতা শনাক্ত করা এখনও চ্যালেঞ্জ। তাই কিছু ক্ষেত্রে মানব অপারেটরের সহায়তা নিতে হয়েছে। লক্ষণীয়ভাবে, শ্রবণক্ষম দর্শকরাও এ অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়েছেন এবং একে যৌথ অনুভূতির অংশ হিসেবে দেখেছেন।
সংগীতানুষ্ঠানেও প্রযুক্তির নতুন প্রয়োগ দেখা গেছে। একটি স্টার্টআপের তৈরি গোলাকার ডিভাইস হাতে নিয়ে শব্দকে আলো ও কম্পনের মাধ্যমে অনুভব করা গেছে। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা আধুনিক প্রযুক্তির স্পর্শে নতুন আবেগ তৈরি করেছে। এক স্বর্ণজয়ী গলফার জানিয়েছেন, কম্পন ও আলোর মাধ্যমে সংগীতের আবেগ তাঁরা অনুভব করতে পেরেছেন।
ডেফলিম্পিকস দেখিয়েছে, যখন অন্তর্ভুক্তি শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ হয়, তখন প্রযুক্তি কেবল সীমাবদ্ধতা দূর করে না, বরং সবার অভিজ্ঞতাকেই সমৃদ্ধ করে। শব্দ তখন আর কেবল শোনার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে দৃশ্যমান, স্পর্শযোগ্য ও সবার জন্য জীবন্ত।







Add comment