শতবর্ষ পেরিয়েও অস্বীকৃত আর্মেনীয় গণহত্যা

‘জেনোসাইড’ বা গোষ্ঠীনিধন অস্বীকার করা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং অনেক গবেষকের মতে এটি নিজেই সেই অপরাধের দীর্ঘস্থায়ী একটি ধাপ। যখন কোনো রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার পরও সেই ঘটনার দায় অস্বীকার করে, তখন তা কেবল ইতিহাস বিকৃত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এতে ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও অস্তিত্বকে আবারও অস্বীকার করা হয়। এই অস্বীকৃতির মাধ্যমে অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করা এবং তাদের আইনি দায় থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে সংঘটিত আর্মেনীয় হত্যাযজ্ঞকে আজও ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকার করেনি তুরস্ক।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে নাৎসি জার্মানির স্বৈরশাসক এক বক্তব্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “আজ আর্মেনীয়দের নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা কে আর মনে রেখেছে?” পোল্যান্ড আক্রমণের প্রস্তুতির সময় সাধারণ মানুষ হত্যার নির্দেশ দিতে গিয়ে তিনি ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় গণহত্যার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। গণহত্যা নিয়ে গবেষকদের মতে, কোনো জেনোসাইডের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধাপ হলো সেটিকে অস্বীকার করা। যখন অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পায়, তখন ভবিষ্যতে নতুন স্বৈরশাসকদের কাছে সেটি এক ধরনের উৎসাহ হিসেবে কাজ করে।

আর্মেনীয় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে। বিশেষ করে কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকারের সময় এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই নিধনযজ্ঞ চালানো হয় বলে বহু ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ রয়েছে। এই আট বছরে অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র থেকে প্রায় ৩০ লক্ষের বেশি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে হত্যা করা হয় অথবা সিরিয়ার মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়।

এই ভুক্তভোগীদের বড় অংশই ছিলেন আর্মেনীয়। তাদের পাশাপাশি আসিরীয় ও গ্রিক সম্প্রদায়ের মানুষও এই নৃশংসতার শিকার হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি আকস্মিক কোনো দাঙ্গা বা সংঘর্ষ ছিল না; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল। উনবিংশ শতাব্দীতে অটোমান প্রশাসনের সংস্কারের সময় সংগৃহীত জনসংখ্যার বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে সংখ্যালঘু নিধনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল।

এই গণহত্যা নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা একটি বিখ্যাত গ্রন্থে অটোমান সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। তুর্কি এক ইতিহাসবিদের লেখা আরেকটি গবেষণাগ্রন্থ বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ তিনি প্রথম তুর্কি গবেষক হিসেবে অটোমান আর্কাইভ বিশ্লেষণ করে এই হত্যাযজ্ঞে রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ তুলে ধরেন। একইভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং মানবাধিকারকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী বইও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে আর্মেনীয়দের ওপর অত্যাচারের পেছনে কেবল জাতিগত বিদ্বেষ নয়, বড় অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করেছিল। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্মেনীয়দের বাড়িঘর, ব্যবসা ও সম্পদ দখল করাই ছিল এই নিধনযজ্ঞের অন্যতম লক্ষ্য। স্থানীয় অনেক মানুষও এই লুটপাটে অংশ নেয়, কারণ তারা আর্মেনীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদ নিজেদের দখলে নিতে আগ্রহী ছিল। তৎকালীন সরকার ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন’ নামে একটি আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই লুটপাটকে বৈধতা দেয়। এর ফলে বহু সম্পদ জোরপূর্বক দখল হয়ে যায় এবং সেই সম্পদের ওপর ভিত্তি করে নতুন এক ধনী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।

গবেষকদের মতে, গণহত্যা অস্বীকারের প্রক্রিয়া হত্যাযজ্ঞ শেষ হওয়ার পর শুরু হয়নি; বরং পরিকল্পনার সঙ্গেই এটি যুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ১৯১৬ সালে অটোমান সরকারের প্রকাশিত একটি প্রচারণামূলক বইয়ের কথা, যেখানে দাবি করা হয় যে আর্মেনীয়রাই নাকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং সরকার ছিল সহনশীল। এভাবে অপরাধী ও ভুক্তভোগীর অবস্থান অদলবদল করে একটি ভিন্ন বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রচারণার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে এক আর্মেনীয় আলোকচিত্রীর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। তাকে জোর করে সাজানো অস্ত্রের ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল, যাতে দেখানো যায় যে আর্মেনীয়রা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অথচ ওই ঘটনার সময় প্রকৃত নির্বাসন ও হত্যাযজ্ঞ এখনো শুরুই হয়নি। অর্থাৎ, বাস্তব ঘটনা ঘটার আগেই রাষ্ট্র নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিল।

গণহত্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল নারীদের ওপর নির্যাতন। পুরুষদের হত্যার পর নারী ও শিশুদের সিরিয়ার মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হয়। পথে অসংখ্য নারী ধর্ষণ, নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হন। অনেককে দাসবাজারে বিক্রি করা হয় বা জোর করে আটকে রাখা হয়। পাশাপাশি বহু নারী ও শিশুকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয় এবং তাদের নাম ও পরিচয় বদলে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শরীরে উল্কি এঁকে দেওয়া হতো যাতে তারা আগের জীবনে ফিরে যেতে না পারে। এইভাবে পরিচয় মুছে দেওয়ার গভীর ক্ষত আজও অনেক মানুষের জীবনে নীরব যন্ত্রণা হয়ে রয়েছে।

অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র এই ঘটনাকে এখনো ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকার করেনি। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মানুষ মারা গিয়েছিল। তাদের দাবি, ১৯১৫ সালের স্থানান্তর আইনের মাধ্যমে আর্মেনীয়দের কেবল সিরিয়া অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিষয়টি স্বীকৃতি না পেতে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক লবিং চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ভেতরেও এই বিষয়ে কথা বললে অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়। তুরস্কের একজন নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক যখন এক সাক্ষাৎকারে আর্মেনীয় হত্যার প্রসঙ্গ তোলেন, তখন তাকে ‘তুর্কি পরিচয়কে অপমান’ করার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই মামলা বাতিল করা হলেও তাকে দীর্ঘ সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়।

আরও মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন তুর্কি-আর্মেনীয় এক সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। দুই দেশের মধ্যে সংলাপের পক্ষে কাজ করায় তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ক্রমাগত হুমকির মধ্যেই ২০০৭ সালে ইস্তাম্বুলে নিজের কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর তুরস্কে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান এবং অতীত ইতিহাসের স্বীকৃতির দাবি তোলেন।

পরবর্তীকালে ২০০৮ সালে তুরস্কে ‘আমি ক্ষমা চাইছি’ নামে একটি নাগরিক উদ্যোগ শুরু হয়, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আর্মেনীয়দের ওপর ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে সমালোচকদের মতে, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফেরত না দিয়ে এবং কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়ে শুধু মৌখিক ক্ষমা চাওয়া সেই ঐতিহাসিক অন্যায়ের পূর্ণ স্বীকৃতি নয়।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed