বিশ্বের অনেক দেশেই এখন তীব্র আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে বাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুযায়ী নতুন ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে বাড়ির দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য বাসস্থান পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত ঘর নির্মাণের উদ্যোগ সামনে আসছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে রোবটচালিত ক্ষুদ্র কারখানা।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নির্মাণশিল্পে শ্রমিকের ঘাটতিও বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণশিল্পের একটি প্রশিক্ষণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ২০২৮ সালের মধ্যে নির্মাণ লক্ষ্য পূরণ করতে প্রায় আড়াই লাখ নতুন শ্রমিক প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে নতুন লোক যোগ দেওয়ার চেয়ে বেশি মানুষ কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নতুন সমাধান সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি বহনযোগ্য মাইক্রো ফ্যাক্টরি তৈরি করেছে, যেগুলো কাঠের মাধ্যমে বাড়ির কাঠামো নির্মাণের বিভিন্ন অংশ তৈরি করতে পারে। এই ক্ষুদ্র কারখানাগুলো মূলত ঘরের দেয়াল, মেঝে ও ছাদের কাঠের ফ্রেম তৈরি করে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা জানিয়েছেন, এসব মাইক্রো ফ্যাক্টরি সাধারণ কাঠমিস্ত্রিদের একটি দলের তুলনায় অনেক দ্রুত, কম খরচে এবং অধিক নির্ভুলভাবে কাঠের প্যানেল তৈরি করতে সক্ষম। ফলে কাঠমিস্ত্রিরা সরাসরি ঘরের কাঠামো স্থাপনের কাজে বেশি সময় দিতে পারবেন।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই ব্যবস্থা মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। তার ভাষায়, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি কোনো কাজ কেড়ে নিচ্ছে না, বরং যেখানে শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে সেখানে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে।
এই প্রযুক্তিতে কাজের প্রক্রিয়াও বেশ সহজ। প্রথমে স্থপতিরা ভবনের নকশা পাঠান। এরপর একটি সফটওয়্যার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিসাব করে কতটি কাঠের প্যানেল লাগবে এবং কত পরিমাণ কাঠ কিনতে হবে।
মাইক্রো ফ্যাক্টরিটি একটি শিপিং কনটেইনারের ভেতরে স্থাপন করা থাকে। এটি নির্মাণস্থলে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়। কারখানার ভেতরে থাকা একটি রোবটিক বাহু কাঠ মাপা, কাটা এবং পেরেক দিয়ে প্যানেল তৈরি করার কাজ করে। এতে দরজা ও জানালার জায়গা ফাঁকা রাখা হয় এবং বৈদ্যুতিক তার ও পাইপলাইনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিদ্রও তৈরি করা হয়। পরে নির্মাণকর্মীরা হাতে সেই প্যানেলগুলো বসিয়ে দেন।
একটি মাইক্রো ফ্যাক্টরি সাধারণ একটি বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের প্যানেল প্রায় একদিনেই তৈরি করতে পারে। যেখানে একই কাজ একটি প্রচলিত কাঠমিস্ত্রি দলের করতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এই প্রযুক্তি দিয়ে সাততলা পর্যন্ত ভবনের কাঠামোও তৈরি করা সম্ভব।
সহপ্রতিষ্ঠাতা ২০১৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। তিনি এর আগে একটি স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় স্থাপত্যে প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের সেবা ব্যবহার করলে প্রচলিত কাঠের ফ্রেমিং দলের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম খরচ হয়। আবার বড় কারখানা থেকে তৈরি প্যানেল এনে নির্মাণস্থলে পরিবহনের তুলনায়ও প্রায় ১৫ শতাংশ সাশ্রয়ী।
পরিবেশগত দিক থেকেও এই প্রযুক্তি সুবিধাজনক বলে দাবি করা হচ্ছে। কাঠ একটি প্রাকৃতিক উপাদান হওয়ায় এতে বাঁক বা গিঁট থাকতে পারে। মাইক্রো ফ্যাক্টরির সফটওয়্যার এসব ত্রুটি বিবেচনায় নিয়ে কাঠের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে, ফলে অপচয় কম হয়।
এ ছাড়া অত্যন্ত নির্ভুলভাবে প্যানেল তৈরি হওয়ায় সেগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগালে ফাঁকফোকর কম থাকে। এতে ঘরের ভেতর থেকে তাপ বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে এবং বাড়ি আরও জ্বালানি সাশ্রয়ী হয়।
বর্তমানে এই প্রযুক্তির তিনটি মাইক্রো ফ্যাক্টরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কাজ করছে এবং চলতি বছর আরও পাঁচটি স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণ খাতের ডিজিটাল ও উদ্ভাবন পরামর্শ প্যানেলের একজন চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে এসব প্রযুক্তিকে সুযোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন এগুলো প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। আধুনিক নির্মাণ ব্যবসায়িক মডেলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে ১৫ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে ইংল্যান্ডে নতুন বাড়ির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির চাহিদা পূরণ করতে হলে ঐতিহ্যগত ইটের ঘরের পরিবর্তে কাঠের ফ্রেমভিত্তিক নির্মাণের দিকে ঝুঁকতে হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করে বাড়ি নির্মাণ করলে ইটের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়।
তবে এখনো অনেক নির্মাতা কাঠ ব্যবহার করতে অনীহা দেখান। তাদের ধারণা, কাঠ ইটের মতো টেকসই নয় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে নির্মিত বাড়ির মাত্র ৯ শতাংশ ছিল কাঠের ফ্রেমের। অথচ স্কটল্যান্ডে এই হার প্রায় ৯২ শতাংশ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে কাঠ ব্যবহার করে ঘর তৈরির প্রচলন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের মানসিকতা ও দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। সেখানে অধিকাংশ একক পরিবারের বাড়িই কাঠের ফ্রেমে তৈরি হয় এবং আবাসন ঘাটতিও কয়েক মিলিয়ন বাড়িতে পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ বর্গমিটার কাঠের প্যানেল উৎপাদনের কাজ চলছে, যা দিয়ে শত শত বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে ২০৩০ সালের মধ্যে এক হাজার মাইক্রো ফ্যাক্টরি স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে, যা বছরে প্রায় দুই লাখ বাড়ির কাঠামো তৈরি করতে পারবে।
সহপ্রতিষ্ঠাতার মতে, আবাসন সংকট কেবল নির্মাণ প্রযুক্তির সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। তার কথায়, যখন ঘরবাড়ির সংখ্যা কম থাকে এবং নির্মাণের গতি ধীর হয়, তখন সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে।





Add comment