সৌরজগতের বরফমণ্ডিত উপগ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম রহস্যময় একটি হলো Uranus–এর উপগ্রহ Miranda। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও এর পৃষ্ঠের অস্বাভাবিক গঠন বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই উপগ্রহের বরফে আচ্ছাদিত পৃষ্ঠের নিচে একসময় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি গভীর একটি মহাসাগর ছিল।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে The Planetary Science Journal–এ। গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে মিরান্ডার বর্তমান ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য কেবলমাত্র বাহ্যিক আঘাত বা প্রাথমিক গঠনের ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ গঠনগত পরিবর্তনেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে বরফের আস্তরণের নিচে তরল জলের উপস্থিতি একসময় ছিল বলে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, তা উপগ্রহটির ইতিহাসকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
১৯৮৬ সালে NASA–এর পাঠানো Voyager 2 মহাকাশযান মিরান্ডার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় এর পৃষ্ঠতলের বিস্ময়কর কিছু চিত্র ধারণ করে। সেই ছবিগুলোতে দেখা যায় বিশাল আকারের চ্যুতি বা ফাটল এবং করোনা নামে পরিচিত তিনটি খাঁজকাটা অঞ্চল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মিরান্ডাকে সৌরজগতের অন্যান্য উপগ্রহ থেকে স্বতন্ত্র করেছে। এত ছোট একটি উপগ্রহে এমন জটিল ভূতাত্ত্বিক গঠন কীভাবে সৃষ্টি হলো, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মিরান্ডার দক্ষিণ গোলার্ধের দুটি প্রধান অঞ্চল বিশ্লেষণ করেছেন, যেগুলো আর্ডেন করোনা ও এলসিনোর করোনা নামে পরিচিত। আর্ডেন অঞ্চলে মূলত প্রসারণজনিত ফাটলের চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। এই ধরনের ফাটল সাধারণত অভ্যন্তরীণ প্রসারণ বা চাপমুক্তির ফলে সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে এলসিনোর অঞ্চলে দেখা যায় সংকোচন বা ভাঁজ পড়া ভূখণ্ড, যা ভিন্ন ধরনের গঠনগত প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।
গবেষকেরা ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রের সঙ্গে উন্নত কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে এই অঞ্চলগুলোর উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাদের সিমুলেশন অনুযায়ী, মিরান্ডার বরফের আস্তরণ সম্ভবত ৩০ কিলোমিটারের কম পুরু ছিল। বরফের স্তর যদি এর চেয়ে বেশি পুরু হতো, তাহলে পৃষ্ঠে এত বড় আকারের ফাটল বা প্রসারণজনিত বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম থাকত। এই বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে বরফস্তরের নিচে একসময় উল্লেখযোগ্য গভীরতার তরল স্তর ছিল।
বিভিন্ন মডেল থেকে প্রাপ্ত তথ্য ইঙ্গিত দেয়, আজ থেকে প্রায় ১০ থেকে ৫০ কোটি বছর আগে মিরান্ডার অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার গভীর একটি মহাসাগর অবস্থান করছিল। মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে এই সময়কালকে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক ধরা হয়। অর্থাৎ উপগ্রহটির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন খুব দূর অতীতের নয়, বরং তুলনামূলকভাবে নিকট অতীতে ঘটেছে।
এই আবিষ্কার মিরান্ডাকে কেবল একটি বরফমণ্ডিত উপগ্রহ হিসেবেই নয়, বরং সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার উদাহরণ হিসেবে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। ছোট আকার সত্ত্বেও এর অভ্যন্তরীণ গঠন যে জটিল ও গতিশীল ছিল, সেই ধারণাই এখন জোরালো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান এই উপগ্রহের অতীত সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে।
মোটের ওপর, সাম্প্রতিক গবেষণা মিরান্ডার ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। বরফের নিচে প্রাচীন মহাসাগরের উপস্থিতির সম্ভাবনা শুধু এই উপগ্রহের গঠনই নয়, বরং সৌরজগতের বরফমণ্ডিত জগতগুলোর বিবর্তন সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করছে।







Add comment