যান্ত্রিক নগরজীবনের নিরন্তর ব্যস্ততা, পেশাগত চাপ, প্রতিযোগিতার দৌড় এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনে আজকের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। স্ট্রেস এখন অনেকের নিত্যসঙ্গী। মানসিক প্রশান্তির জন্য সময় বের করাই যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসক ও মনস্তাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন থেরাপি ও বিনোদনমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করে আসছেন। তবে মুসলিম সমাজে ইবাদত কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং এটি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মিক পরিশুদ্ধির একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবী-রাসুলেরা তাঁদের উম্মতের আত্মিক ও মানসিক কল্যাণে ইবাদতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যখন একজন মানুষ পার্থিব সব উদ্বেগ সরিয়ে একান্ত মনোযোগে স্রষ্টার সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর অন্তরে যে প্রশান্তি নেমে আসে, তা অনেক আধুনিক থেরাপির সমতুল্য বলেই মনে করা হয়। একাগ্রচিত্তে প্রার্থনার সময় স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে শিথিল হয় এবং শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা হ্রাস পেতে পারে। নিজের অসহায়ত্ব, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করার মধ্য দিয়ে মানসিক ভার লাঘব হয়, অন্তরে স্থিতি ফিরে আসে।
পবিত্র মাহে রমজান শুরু হয়েছে। এ সময় কর্মঘণ্টা কিছুটা কমলেও বাস্তবে দায়িত্ব ও কাজের চাপ কমে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, মানসিক চাপের প্রধান কারণগুলো পরিবেশগত প্রতিকূলতা, ব্যক্তিগত জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলিত ফল। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পেশাগত চাপই অনেক ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময়সীমা পূরণের তাগিদে একসঙ্গে একাধিক কাজ করার প্রবণতা স্নায়ুর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষাপটে ইবাদত হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প অনুশীলন, বিশেষ করে রমজান মাস এ অনুশীলনের উপযুক্ত সময়।
নিয়মিত ইবাদত মানুষের জীবনে সময়ানুবর্তিতা আনে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জিকির দৈনন্দিন জীবনকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসে। নির্দিষ্ট সময়ে ইবাদতের অভ্যাস কর্মজীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভোরে ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দিনের শুরু করলে সময়ের সদ্ব্যবহার সহজ হয়, কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় এবং রাতের ঘুমও নিয়মিত হয়। রমজানে সংযম ও আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি কাজ ও ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করলে মানসিক চাপ থেকে মুক্তির পথ সুগম হতে পারে। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তাই মাসের শুরু থেকেই কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দিনের পূর্বপরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। সাহ্রির পর শরীরের শক্তির মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই দিনের গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজগুলো সকালের দিকে সম্পন্ন করার চেষ্টা ফলপ্রসূ হতে পারে। এতে কাজের চাপ কমে এবং মানসিক অস্থিরতা হ্রাস পায়।
যাতায়াতের সময়ও সুফল বয়ে আনতে পারে। যানজটে বসে বা অফিসে যাওয়া আসার পথে অযথা সামাজিক মাধ্যমে সময় ব্যয় না করে জিকির করা, কোরআন তিলাওয়াত শোনা অথবা উপকারী কোনো পডকাস্ট শোনা যেতে পারে। এতে সময়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং মন ইতিবাচকতায় ভরে ওঠে।
কর্মব্যস্ততার মাঝেও ইবাদতের জন্য অল্প সময় বের করা মানসিক পুনরুজ্জীবনের মতো কাজ করতে পারে। একাগ্রচিত্তে ইবাদতের মুহূর্ত মানুষকে সাময়িকভাবে পার্থিব কোলাহল থেকে মুক্ত করে। এতে মনের অস্থিরতা কমে, একঘেয়েমি দূর হয় এবং কাজের প্রতি নতুন উদ্যম তৈরি হয়।
রমজানে রাতের ঘুম কিছুটা কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুযোগ থাকলে দুপুরে স্বল্প সময়ের বিশ্রাম বা কাইলুলা গ্রহণ শরীর ও মনকে সতেজ রাখে। অল্প সময়ের এই বিশ্রাম রাতের ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
পরিশেষে, ইবাদতকে দৈনন্দিন কাজের তালিকার একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে না দেখে দিনের সবচেয়ে প্রশান্তিময় সময় হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। রমজানে ধীরস্থিরভাবে স্রষ্টার সঙ্গে কাটানো নিরিবিলি সময় আধুনিক জীবনের চাপ সামলানোর শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। আত্মিক সংযোগ ও মানসিক শুদ্ধির এই অনুশীলনই হতে পারে অন্তরের স্থিরতা ও প্রশান্তির প্রকৃত পথ।







Add comment