যুক্তরাজ্যের চাকরির বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার শঙ্কা

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়চাপের কারণে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় দেশটির চাকরির বাজার এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক দুটি পৃথক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

গত সোমবার প্রকাশিত হিসাবরক্ষণ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিডিওয়ের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মাসিক কর্মসংস্থান সূচক প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের মার্চ মাসে এই সূচক এত নিচে নেমেছিল। সে সময় বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজার ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে ছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসংস্থান সূচকটি নিয়োগের প্রবণতা, কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শ্রমের চাহিদা পরিমাপের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এই সূচক দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৩০-এ, যা জানুয়ারির তুলনায় অপরিবর্তিত রয়েছে। সাধারণত সূচকটি ৯৫-এর ওপরে থাকলে কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় এবং এর নিচে থাকলে সংকোচনের প্রবণতা বোঝায়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বছরের শুরুতে সূচকের পতনের গতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও স্বল্পমেয়াদে শ্রমবাজারে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে কেপিএমজি এবং রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট কনফেডারেশন-আরইসি যৌথভাবে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় ধরনের কর্মী নিয়োগের চাহিদাই কমেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নেওয়ার বিষয়ে অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থান বজায় রাখছে।

সরকারি পরিসংখ্যানেও শ্রমবাজারের একই ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তরুণদের বেকারত্বের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এটি প্রায় ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

দেশটির অফিস ফর দ্য বাজেট রেসপনসিবিলিটি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরে বেকারত্বের হার আরও বাড়তে পারে এবং তা ৫ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর আগে গত নভেম্বরে সংস্থাটি বেকারত্বের সম্ভাব্য হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বলে ধারণা দিয়েছিল। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই পূর্বাভাস সংশোধন করা হয়েছে।

তবে শ্রমবাজারের এই দুর্বলতার মাঝেও অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বিডিও জানিয়েছে, তাদের ব্যবসায়িক আউটপুট সূচক ফেব্রুয়ারি মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৮০-এ, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূলত সেবা খাতের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই উন্নতি হয়েছে। টানা তিন মাস ধরে সূচকটিতে পুনরুদ্ধারের ধারা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে স্থায়ী কর্মীর চাহিদা বেড়েছে কেবল প্রকৌশল খাতে। বিপরীতে খুচরা বাণিজ্য এবং হোটেল ও ক্যাটারিং খাতে স্থায়ী পদে নিয়োগ সবচেয়ে বেশি কমেছে। একই চিত্র অস্থায়ী চাকরির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে খুচরা খাতেই সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে।

কেপিএমজি-ইউকের প্রধান নির্বাহী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন ঘটনার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারও অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি নিয়োগ পরিকল্পনায় পড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজার এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ফলে স্বল্পমেয়াদে নিয়োগ কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি ফিরে আসার সম্ভাবনা সীমিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed