ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাসো এভিয়েশন থেকে ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার একটি প্রাথমিক প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত একটি সামরিক ক্রয় প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন রুপি, যা ডলারে প্রায় ২৮ হাজার ৪০ কোটি সমপরিমাণ। প্রতিরক্ষা খাতে এটি একটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনুমোদনের ফলে এখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করার পথ সুগম হয়েছে।
ভারতের বিমানবাহিনীর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এই ক্রয় প্রস্তাব বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাহিনীর ফাইটার স্কোয়াড্রনের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯-এ। অথচ অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী এই সংখ্যা হওয়া উচিত ৪২। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
অন্যদিকে, বিমানবাহিনীর বহরে থাকা বেশ কিছু পুরোনো যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে অবসরে গেছে অথবা অবসরের পথে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত সোভিয়েত যুগের মিগ ২১ আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে পাঠানো হয়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মিগ ২৯ এর কিছু প্রাথমিক সংস্করণ, অ্যাংলো ফরাসি জাগুয়ার এবং ফরাসি নির্মিত মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমানও ধাপে ধাপে অবসরে যাবে বলে জানা গেছে। ফলে বহরের সক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মের বিমান যুক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভারতের সশস্ত্র বাহিনী ঐতিহাসিকভাবে আমদানিনির্ভর। বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে বাহিনীর প্রয়োজন মেটানো হয়ে থাকে। তবে বর্তমান সরকার কয়েক বছর ধরে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো এই নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সোভিয়েত আমলের মিগ ২১ এর বিকল্প হিসেবে সম্প্রতি দেশীয়ভাবে তৈরি তেজস যুদ্ধবিমান বিমানবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। এটি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকসের কাছে উন্নত এমকে ১ সংস্করণের প্রায় ১৮০টি তেজস উড়োজাহাজের অর্ডার রয়েছে। তবে ইঞ্জিন সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। জিই অ্যারোস্পেসের ইঞ্জিন সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা উৎপাদন ও ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে।
এ অবস্থায় ফ্রান্স থেকে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুমোদিত প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সামনে দুই দেশের মধ্যে মূল্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এসব আলোচনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বহরে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে বিমানবাহিনীর কার্যক্ষমতা ও প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত ও অবসরপ্রাপ্তপ্রায় বিমানগুলোর ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে এবং আলোচনার ফলাফলের ওপরই চূড়ান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।







Add comment