যুক্তরাষ্ট্রে গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাত এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধি অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২২ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মূল কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দাম বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পেট্রোলের বাজারে, ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
একজন তরুণ ট্রাকচালক জানান, আগের তুলনায় জ্বালানির খরচ অনেক বেড়েছে। আগে যেখানে অর্ধেক ট্যাংক তেল ভরতে ৫০ থেকে ৬০ ডলার লাগত, এখন সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০ ডলারে। খরচ কমানোর চেষ্টা করলেও পেশাগত কারণে গাড়ি চালানো কমানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ, যা ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একই সময়ে ভারী তেলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে এর প্রভাব আরও বেশি দেখা গেছে। সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম প্রায় ৫ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে জাতীয় গড় ৪ দশমিক ১৬ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই জ্বালানি খাতের দাম বৃদ্ধির কারণে হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানভাড়া ও পোশাকের দামও বেড়েছে, যার পেছনে জ্বালানি ব্যয় ও শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। যদিও খাদ্যপণ্যের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে, তবে পরিবহন ও সার খরচ বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক বিশ্লেষক জানান, জ্বালানিনির্ভর মূল্যস্ফীতি আবার ফিরে আসছে। যদিও এটি এখনো পুরো অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেনি, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বিস্তৃত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলোচনার মাধ্যমে এটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। বর্তমানে তেলের দাম কিছুটা কমলেও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ভোক্তাদের আস্থার ওপরও পড়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা গেছে, চলতি মাসে ভোক্তা আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এটি রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অনেক ভোক্তা জানিয়েছেন, আগে যেখানে একটি গাড়িতে জ্বালানি নিতে ৮০ ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ১৪০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং তারা এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এদিকে দেশের প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর ছাড়, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। পাশাপাশি কিছু পণ্যের দাম কমার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য ও জ্বালানি বাদ দিয়ে হিসাব করা ‘কোর ইনফ্লেশন’ তুলনামূলকভাবে কম হারে বেড়েছে, যা দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে। কিছু বিশ্লেষক এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন এবং মনে করছেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়লেও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাপ এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে চলতি বছরে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের ভুল পূর্বাভাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার আরও সতর্ক অবস্থান নেবে।





Add comment