মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখে বদলে গেল ভাবনা

মহাকাশের বিশাল শূন্যতা অনেক সময় মানুষের চিন্তাভাবনাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার পর এমন এক উপলব্ধির কথা জানিয়েছেন মার্কিন মহাকাশ সংস্থার এক নভোচারী। টানা ১৭৮ দিন মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতার পর তিনি মনে করেছেন, পৃথিবীর বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো একটি ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

২০১১ সালের ৪ এপ্রিল মহাকাশযাত্রা শুরু করেন এই নভোচারী। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করার পর একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন। মহাকাশে অবস্থানকালে প্রায় তিন হাজারবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। তাঁর মতে, মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে মানবসভ্যতা সম্পর্কে অনেক প্রচলিত ধারণাই নতুনভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

মহাকাশ স্টেশনের জানালা দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে তিনি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন। দূর থেকে পৃথিবীকে অত্যন্ত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল মনে হলেও বাস্তবে মানুষ এই গ্রহটিকে সেভাবে পরিচালনা করছে না। মহাকাশ থেকে দেখা যায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, জীববৈচিত্র্য এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কতটা নাজুক ও সংবেদনশীল। অথচ মানবসমাজ এই অমূল্য সম্পদগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যেন এগুলোর মূল উদ্দেশ্য কেবল অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করা।

এক সাক্ষাৎকারে এই নভোচারী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এমন এক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর মতে, পৃথিবী, সমাজ এবং অর্থনীতি—এই তিনটি উপাদানের মধ্যে সম্পর্ক নতুনভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে মানবসমাজ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চিন্তা করে, এরপর আসে সমাজ ও পরিবেশের বিষয়। অথচ এই ক্রম পরিবর্তন করে প্রথমে গ্রহ, তারপর সমাজ এবং সর্বশেষে অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, এভাবে চিন্তার কাঠামো পরিবর্তন না করলে মানবসভ্যতার টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।

মহাকাশচারীদের মধ্যে এ ধরনের মানসিক পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা ‘ওভারভিউ ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। মহাকাশ গবেষকেরা বলেন, মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখার সময় অনেক নভোচারীর মধ্যেই এই অনুভূতি তৈরি হয়। প্রথমবারের মতো ১৯৮৭ সালে এক মহাকাশ গবেষক এই শব্দটি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় সেই গভীর উপলব্ধিকে, যখন মানুষ দূর থেকে নিজের গ্রহকে দেখে এর সৌন্দর্য ও ভঙ্গুরতা উপলব্ধি করে।

এই অভিজ্ঞতার ফলে নভোচারীরা সাধারণত মানবজাতির প্রতি এক ধরনের গভীর সংযোগ ও দায়বদ্ধতা অনুভব করেন। পৃথিবীকে সীমান্তহীন একটি গ্রহ হিসেবে দেখতে শুরু করেন তারা। এই উপলব্ধির মাধ্যমে বোঝা যায়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একে অপরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত এবং পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল।

এই নভোচারীর মতে, ‘ওভারভিউ ইফেক্ট’ মূলত সেই মুহূর্তের উপলব্ধি, যখন মানুষ বুঝতে পারে যে আমরা সবাই একটি অভিন্ন ব্যবস্থার অংশ। মানবসভ্যতা, পরিবেশ এবং গ্রহের অস্তিত্ব পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সময় এই পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, মানুষ প্রকৃতপক্ষে মহাকাশের বাইরে বাস করে না। বরং মানুষ নিজেই মহাকাশের একটি অংশ। তাঁর ভাষায়, মানবজাতি হচ্ছে সেই মহাবিশ্বের অংশ, যা ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। এই উপলব্ধি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে এবং পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে।

তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য সবার মহাকাশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মনে করেন। পৃথিবীতে থেকেও মানুষ বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহ ও মানবসভ্যতাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারে। তিনি একে ‘অরবিটাল পারসপেক্টিভ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের অবস্থানকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে এই মার্কিন নভোচারী বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। সেই সফরে তিনি মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতা এবং পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখার বিষয়টি বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরেন।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed