ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে অনেকেই দূরদূরান্ত পাড়ি দেন। আবার কেউ কেউ নিকটবর্তী কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে অনীহা দেখান। তবে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে শত শত মাইল ওপরে অবস্থান করেও ভোট দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের নভোচারীরা। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকেও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি শুনতে অস্বাভাবিক মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে মহাকাশচারীদের পৃথিবীর বাইরে অবস্থানকালীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়। যেহেতু নাসার জনসন স্পেস সেন্টার হিউস্টনে অবস্থিত, তাই অধিকাংশ মার্কিন নভোচারী হ্যারিস কাউন্টির ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকেন এবং সেখান থেকেই তাঁদের ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ থেকে ভোট গ্রহণের পদ্ধতিটি অত্যন্ত নিরাপদ ও গোপনীয়তা-নির্ভর। প্রথম ধাপে হ্যারিস কাউন্টি ক্লার্কের কার্যালয় একটি বিশেষভাবে সুরক্ষিত ইলেকট্রনিক ব্যালট জনসন স্পেস সেন্টারের মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে পাঠায়। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যালট আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রেরণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট নভোচারীরা নিজস্ব গোপন কোড ব্যবহার করে ব্যালটটি পূরণ করেন। ভোট প্রদান সম্পন্ন হলে ব্যালটটি পুনরায় ইমেইলের মাধ্যমে কাউন্টি ক্লার্কের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হয় যাতে ভোটের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।
মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে সয়ুজ ১১ অভিযানের ক্রুরা ভোট দেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে তিন নভোচারী সের্গেই ক্রিকালেভ, ভ্যালেরি পোলিয়াকভ ও আলেকজান্ডার ভলকভ মির স্পেস স্টেশন থেকে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
১৯৯৭ সালে রাশিয়ার মির স্পেস স্টেশনে অবস্থানরত মার্কিন নভোচারী ডেভিড উলফ প্রথমবারের মতো মহাকাশ থেকে ভোট দেন। তিনি হিউস্টনের একটি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেন এবং সুরক্ষিত ইলেকট্রনিক ব্যালটের মাধ্যমে তাঁর ভোট প্রদান করেন। এই ঘটনা মহাকাশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতেও একাধিক নভোচারী মহাকাশ থেকে ভোট দিয়েছেন। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লেরয় চিয়াও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নভোচারী ক্যাথলিন রুবিনস ২০১৬ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে মহাকাশ থেকে ভোট দেন। ২০২০ সালে নাসার নভোচারী কেট রুবিনসও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ব্যালট জমা দেন।
এ ছাড়া ফরাসি নভোচারী থমাস পেসকু ২০১৭ সালে মহাকাশে অবস্থানকালে ভোট প্রদান করেন। একই বছরে দুই নভোচারী বুচ উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামসও মহাকাশ থেকে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে থেকেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার এই দৃষ্টান্ত বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মহাকাশ অভিযানে ব্যস্ত থাকার পরও নাগরিক দায়িত্ব পালনের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক অধিকার ভূগোলের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির সহায়তায় পৃথিবীর বাইরেও ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বের গণতান্ত্রিক চর্চাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।







Add comment