মহাকাশ থেকে ভেসে আসা রহস্যময় রেডিও তরঙ্গ ও এক্স-রে সংকেত নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মিল্কিওয়ে ছায়াপথের ভেতরে অবস্থান করা একটি অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তু। ‘এএসকেএপি জে১৮৩২০৯১১’ নামে পরিচিত এই বস্তুটি নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে শক্তিশালী সংকেত পাঠাচ্ছে, যা এখনো প্রচলিত কোনো মহাকাশীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ৪৪ মিনিট পরপর বস্তুটি রেডিও তরঙ্গের পাশাপাশি এক্স-রে সংকেত ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি টেলিস্কোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে পাথফাইন্ডার বা এএসকেএপি রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রথম এই শক্তিশালী সংকেত শনাক্ত করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বস্তুটি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের ভেতরের এক দূরবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছে। ওই অঞ্চলে সাধারণত নক্ষত্র, গ্যাস এবং নানা ধরনের মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষ থাকলেও এই বস্তুটির নির্গত তীব্র ও ছন্দময় ঝলকানি বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, বস্তুটি ‘লং পিরিয়ড রেডিও ট্রানজিয়েন্ট’ নামে পরিচিত এক বিরল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণির বস্তুগুলো সাধারণ পালসার নক্ষত্রের তুলনায় অনেক ধীর গতিতে সংকেত পাঠায়। যেখানে পালসার নক্ষত্র প্রতি সেকেন্ডে একাধিকবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে এবং সংকেত নির্গত করে, সেখানে এই বস্তুটির ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ সংকেত চক্র সম্পন্ন হতে সময় লাগছে ৪৪ মিনিট। এই দীর্ঘ ব্যবধানই একে প্রচলিত মহাকাশীয় বস্তু থেকে আলাদা করে তুলেছে।
নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু রেডিও তরঙ্গই নয়, এক্স-রে সংকেতও একই ৪৪ মিনিটের ছন্দ মেনে ওঠানামা করছে। এই ধরনের বস্তুতে রেডিও ও এক্স-রের এমন সমন্বিত আচরণ আগে কখনো পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, উভয় সংকেতের উৎস সম্ভবত একই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তবে সেই প্রক্রিয়া কী, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি রিসার্চের গবেষকদের মতে, ‘এএসকেএপি জে১৮৩২০৯১১’ এখনো এক অমীমাংসিত রহস্য। কেউ কেউ ধারণা করছেন, এটি কোনো ব্যতিক্রমধর্মী নিউট্রন স্টার হতে পারে, যার চৌম্বকীয় শক্তি অত্যন্ত প্রবল। আবার কারও মতে, এটি কোনো চৌম্বকীয় ধ্বংসাবশেষ, যা প্রচলিত মডেলের বাইরে আচরণ করছে। এমনকি এটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কোনো মহাজাগতিক বস্তু হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে এই বস্তুটি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের এক কোণ থেকে নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সংকেত পাঠিয়ে যাচ্ছে। এর আচরণ বিদ্যমান মহাকাশীয় তত্ত্ব ও মডেলগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রহস্যের জট খুলতে পারবেন। ততদিন পর্যন্ত ‘এএসকেএপি জে১৮৩২০৯১১’ বিজ্ঞানীদের কাছে এক অনিশ্চিত প্রশ্নচিহ্ন হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।






Add comment