মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, রাশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন করে গতি সঞ্চার করেছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ফেডারেল বাজেটের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করছে এবং ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিচ্ছে।
শুধু তেল নয়, এই সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেও রাশিয়ার আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ সহযোগী জানান, এত দিন রাশিয়াকে ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে হলেও এখন তারা বাজারদরেই তেল বিক্রি করতে পারছে। এটি দেশটির অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের আগে রাশিয়া বাজেট সংকটে পড়ার আশঙ্কায় ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা সেই সংকট পুরোপুরি দূর না করলেও সময়ের কিছুটা সুযোগ তৈরি করেছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা আগে বাস্তবায়নের কথা ছিল।
জ্বালানি খাতে এই উত্থানের স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে তেলের দামে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার উরাল তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছায়, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এতে এক মাসেই অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যার বড় অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ছে।
এক ইউরোপভিত্তিক থিঙ্কট্যাংকের জ্যেষ্ঠ ফেলোর মতে, রাশিয়ার বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তেল ও গ্যাস বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই আয় ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং এতে প্রতিপক্ষ দেশের জন্য চাপ তৈরি হচ্ছে।
সংঘাত শুরুর আগে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলের ক্রেতা কমে যাচ্ছিল এবং বড় ক্রেতারাও কম দামে তেল কিনতে চাপ দিচ্ছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল রপ্তানি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং আয়ও কমে যায়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ববাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করায় রাশিয়ার তেলের চাহিদা আবার বেড়েছে। বিশেষ করে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বেশি দামে তেল কিনতেও দেখা গেছে।
এদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই ক্ষতির প্রভাব অনেকটাই সামলে দিচ্ছে। ড্রোন হামলা ও পাইপলাইন সংকটে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেলেও আয় বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের বাজারেও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে এসব পণ্যের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ায় রাশিয়া বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে এগিয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যতম বড় সার রপ্তানিকারক হওয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন অর্ডার পাচ্ছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীলতায় রূপ নিতে পারে। একইভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও রাশিয়ার গুরুত্ব বাড়ছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
ভারত ও চীনও তাদের জ্বালানি কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পথ খুলে দিতে পারে।
তবে এই সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাতের প্রভাবে চীন ও ভারত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে পারে এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয় ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব রাশিয়ার অর্থনীতিতেও পড়ছে। একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও তুলনামূলক কম থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে তেল ও গ্যাস থেকে বাড়তি আয় রাশিয়াকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যুদ্ধের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ঋণও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।





Add comment