যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসের শুরু অনেক ভাড়াটিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নির্ধারিত সময়ে বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন অসংখ্য পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভরসা করছেন নতুন ধরনের একটি সেবার ওপর, যার নাম ‘রেন্ট নাউ, পে লেটার’। এই ব্যবস্থায় ভাড়াটিয়ারা একসঙ্গে পুরো ভাড়া না দিয়ে কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এতে সুবিধার পাশাপাশি অতিরিক্ত খরচের চাপও তৈরি হচ্ছে।
মিশিগান অঙ্গরাজ্যের মুসকেগনে বসবাসকারী এক স্কুল ক্যারিয়ার কাউন্সেলর কয়েক বছর আগে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। স্ত্রী তার বীমা কোম্পানির চাকরি হারানোর পর দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া সময়মতো দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে তাদের জন্য। তখন তিনি ভাড়া কিস্তিতে পরিশোধের একটি অনলাইন সেবার সাহায্য নেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় হঠাৎ জরুরি খরচ এসে পড়ে, যেমন কয়েক হাজার ডলারের কোনো বিপদ। অনেক মানুষই মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালান। নির্ধারিত সময়ে একটি পেমেন্ট মিস করলেই তাদের পুরো আর্থিক পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনা ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ভাড়াটিয়া পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি ‘কস্ট-বার্ডেনড’ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ, তারা তাদের মোট আয়ের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বাসাভাড়ার পেছনে ব্যয় করে। ‘বাই নাউ, পে লেটার’ ব্যবস্থার মতোই ‘রেন্ট নাউ, পে লেটার’ প্ল্যাটফর্মগুলো মাসের শুরুতেই বাড়িওয়ালাকে পুরো ভাড়া পরিশোধ করে দেয়। এরপর ভাড়াটিয়ারা ধাপে ধাপে সেই অর্থ পরিশোধ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সেবার জনপ্রিয়তা বাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মজুরি প্রায় স্থির থাকলেও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নগদ অর্থের সংকটে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
এক আর্থিক বিশ্লেষক বলেন, লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য ভাড়া সবচেয়ে বড় মাসিক ব্যয়। মানুষ যখন এই খরচটিও কিস্তিতে ভাগ করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন এটি উদ্বেগের বিষয়। এতে বোঝা যায় অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় সঞ্চয় বা নগদ অর্থ নেই।
অ্যাপার্টমেন্ট লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ভাড়া কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে জাতীয় গড় ভাড়া ছিল ১,৩৫৭ ডলার। মহামারির আগের সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ২০০ ডলার বেশি। এর পেছনে আবাসন সংকট ও সীমিত সরবরাহ বড় ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে ‘বাই নাউ, পে লেটার’ খাতে পরিচিত একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি ভাড়া খাতে পরীক্ষামূলক একটি কর্মসূচি চালু করেছে। পাশাপাশি Livble, Qira ও Flex-এর মতো প্রতিষ্ঠানও এই বাজারে সক্রিয়। এর মধ্যে Flex অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম, যা প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ গ্রাহককে সেবা দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এগুলো ভাড়াটিয়াদের আর্থিক নমনীয়তা দেয় এবং বাজেট পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। তবে এই সেবাগুলো বিনামূল্যে নয়।
যদি কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, কিছু প্ল্যাটফর্ম তাকে সাময়িকভাবে সেবা থেকে বাদ দেয় যতক্ষণ না পুরো ঋণ পরিশোধ করা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান দেরিতে পরিশোধের জন্য সুদ বা জরিমানা না নিলেও মাসিক ফি নেয়।
উদাহরণ হিসেবে Flex প্ল্যাটফর্ম প্রতি মাসে ১৪ দশমিক ৯৯ ডলার সদস্য ফি এবং ভাড়ার পরিমাণের ১ শতাংশ চার্জ করে। কেউ যদি জাতীয় গড় ১,৩৫৭ ডলার ভাড়া দেন, তাহলে প্রতি মাসে প্রায় ২৯ ডলার অতিরিক্ত ফি দিতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যারা ইতোমধ্যেই আর্থিক চাপে রয়েছেন, তাদের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একজন ভোক্তা অধিকার সংস্থার আর্থিক সেবাবিষয়ক পরিচালক বলেন, যদি কেউ তার আয়ের অর্ধেকের বেশি ভাড়ায় ব্যয় করেন, তাহলে প্রতিটি ডলারই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ ডলার ফি দেওয়া অনেকের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
তবু আবাসন ব্যয় উচ্চ অবস্থায় থাকায় এই ধরনের সেবার চাহিদা বাড়তেই পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইন্ডিয়ানাভিত্তিক একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তাদের ব্যবস্থাপনায় দুই হাজারের বেশি ইউনিট রয়েছে। তিন বছর আগে Flex সেবা চালু করার পর থেকে ভাড়াটিয়াদের মধ্যে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যেখানে মাত্র ৪ শতাংশ পরিবার ভাড়া কিস্তিতে দিত, বর্তমানে সেই হার বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত Flex-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ ডলার ভাড়া পরিশোধ হয়েছে।
তবে এই সুবিধা ভাড়াটিয়াদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও বকেয়া ভাড়ার সমস্যা এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন স্বাস্থ্যসেবার খরচ বহন করা কঠিন। একইভাবে ৪৫ শতাংশ মানুষ মুদি পণ্য এবং ইউটিলিটি বিলকেও অস্বাভাবিক ব্যয়বহুল বলে মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে অনেক মানুষই আর্থিকভাবে সংগ্রাম করছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবায় বড় বিনিয়োগও দেখাচ্ছে যে দেশে সামগ্রিকভাবে ব্যয় সামর্থ্যের একটি মৌলিক সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে এই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বীকার করছে যে ‘রেন্ট নাউ, পে লেটার’ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। একটি প্ল্যাটফর্মের জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সেবা আবাসন সংকট বা কম আয়ের সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সাশ্রয়ী আবাসনের সংখ্যা বাড়ানো বা মানুষের আয় বৃদ্ধি করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।





Add comment