Bp News USA

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়

বিশ্ববাজারে টানা এক বছর ধরে সোনার দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য নীতিকে ঘিরে বৈশ্বিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে মূল্যবান এই ধাতুর ওপর। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে এসে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সোনার প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছায়। এরপর ঊর্ধ্বগতিতে কিছুটা বিরতি এলেও দাম এখনো ৫ হাজার ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আউন্সপ্রতি সোনার দাম ৭ হাজার ডলারে উন্নীত হতে পারে।

সোনার দাম নির্ধারণের ভিত্তি

সোনা বা সোনাভিত্তিক পণ্যের মূল্য নির্ধারণে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো ওজন, যা ট্রয় আউন্সে পরিমাপ করা হয়। অন্যটি হলো বিশুদ্ধতা, যা ক্যারেট দ্বারা নির্ধারিত।

ওজনের হিসাব

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতুর ওজন ট্রয় আউন্সে মাপা হয়। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম যদি ৫ হাজার ডলার হয়, তাহলে প্রতি গ্রাম সোনার দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৬০ ডলার। সে হিসাবে এক কেজি সোনার বারের মূল্য প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে ট্রয় আউন্স এবং সাধারণ আউন্স এক নয়। সাধারণ আউন্সের ওজন ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম, যা মূলত খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

বিশুদ্ধতার মানদণ্ড

দেশীয় বাজারে সোনার দামের সংবাদে সাধারণত ২২, ২১ বা ১৮ ক্যারেটের আলাদা মূল্য উল্লেখ থাকে। ক্যারেট মূলত সোনার বিশুদ্ধতার পরিমাপক। খাঁটি সোনা ২৪ ক্যারেট হিসেবে বিবেচিত হয়। ২২, ২১ বা ১৮ ক্যারেট সোনায় রুপা, তামা বা দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু মিশ্রিত থাকে।

আন্তর্জাতিকভাবে সোনার গয়নায় বিশুদ্ধতার চিহ্ন ব্যবহার বাধ্যতামূলক। যেমন ২৪কে বা ৯৯৯ মানে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা। ১৮ ক্যারেট সোনায় সাধারণত ৭৫০ লেখা থাকে, যা ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধতার নির্দেশক।

২৪ ক্যারেট সোনা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ, রং গাঢ় কমলা, নরম প্রকৃতির এবং সাধারণত বিনিয়োগের কয়েন বা বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২২ ক্যারেট সোনা ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ বিশুদ্ধ, মাঝারি টেকসই এবং বিলাসবহুল গয়নায় ব্যবহৃত হয়। ১৮ ক্যারেট সোনা ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ, তুলনামূলক বেশি টেকসই এবং উন্নতমানের গয়নায় প্রচলিত। ৯ ক্যারেট সোনা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিশুদ্ধ, ফিকে হলুদ রঙের, বেশি টেকসই এবং কম দামি গয়নায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ১৪ ও ১০ ক্যারেট সোনাও বিভিন্ন দেশে প্রচলিত।

গয়নার দাম নির্ধারণে সেদিনের স্পট মূল্য, তৈরির খরচ ও কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রাহক সঠিক ওজন ও ক্যারেট সম্পর্কে অবগত থাকলে মূল দামের সঙ্গে কারিগরি খরচ যোগ করে মূল্য যাচাই করতে পারেন। সাধারণত স্পট মূল্যে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না, তবে তৈরির খরচে দরদাম করা যায়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দামের উত্থান

সোনার ব্যবহার হাজার বছরের পুরোনো। এটি মুদ্রা, অলংকার ও সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সোনা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

একসময় সোনার মানের ভিত্তিতে মুদ্রা চালু ছিল। ১৮৩৪ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ক্লাসিক্যাল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ২০ ডলারের বিনিময়ে এক আউন্স সোনা পাওয়া যেত। মহামন্দার সময় ১৯৩৩ সালে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর থেকে বাজারশক্তির ওপর ভিত্তি করে সোনার দাম নির্ধারিত হচ্ছে।

গত এক দশকে সোনার দাম চার গুণ বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে প্রতি আউন্সের দাম ছিল ১ হাজার ২৫০ ডলার, বর্তমানে তা প্রায় ৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে দাম আরও বাড়তে পারে।

দেশভেদে দামের পার্থক্য

আন্তর্জাতিকভাবে লন্ডন ও নিউইয়র্কের এক্সচেঞ্জে ট্রয় আউন্সপ্রতি সোনার স্পট মূল্য নির্ধারিত হয় মার্কিন ডলারে। পরে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বাজারে তা নিজস্ব মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও চাহিদাভিত্তিক প্রিমিয়াম যুক্ত হয়।

শুল্কনীতিও দামের ওপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে সোনার ওপর ৩ শতাংশ জিএসটি আরোপ করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনতে কর দিতে হয় না।

সোনার মজুতে শীর্ষ দেশ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়িয়েছে। এতে বৈশ্বিক দামে প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন। দ্বিতীয় স্থানে জার্মানি, তাদের মজুত ৩ হাজার ৩৫০ টন। তৃতীয় অবস্থানে ইতালি, যাদের কাছে রয়েছে ২ হাজার ৪৫১ টন সোনা।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সোনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে এর চাহিদা ভবিষ্যতেও প্রভাব বিস্তার করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed