বিশ্ববাজারে গত এক বছরে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাবে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মূল্যবান এই ধাতুর প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে অবশ্য ঊর্ধ্বগতি কিছুটা থেমে আসে এবং বর্তমানে তা ৫ হাজার ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
বিশ্ববাজারে সোনার মূল্য নির্ধারণে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ওজন এবং বিশুদ্ধতা। আন্তর্জাতিকভাবে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতুর ওজন ট্রয় আউন্সে নির্ধারণ করা হয়। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার হয়, তাহলে প্রতি গ্রাম সোনার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬০ ডলার। সেই হিসাবে এক কেজি ওজনের সোনার বারের দাম হয় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। উল্লেখ্য, ট্রয় আউন্স এবং সাধারণ আউন্স এক নয়। সাধারণ আউন্সের ওজন ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম, যা মূলত খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
সোনার বিশুদ্ধতা পরিমাপ করা হয় ক্যারেটে। খাঁটি সোনা ২৪ ক্যারেট হিসেবে বিবেচিত, যার বিশুদ্ধতা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৪কে বা ৯৯৯ চিহ্ন দিয়ে তা বোঝানো হয়। ২২ ক্যারেট সোনার বিশুদ্ধতা ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বিলাসবহুল গয়নায় বেশি ব্যবহৃত হয়। ১৮ ক্যারেট সোনায় বিশুদ্ধতার হার ৭৫ শতাংশ এবং ৯ ক্যারেটে তা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ১৪ ক্যারেট ও ১০ ক্যারেট সোনাও বিভিন্ন দেশে প্রচলিত। সাধারণত সোনার সঙ্গে রুপা, তামা বা দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু মিশিয়ে বিভিন্ন ক্যারেট নির্ধারণ করা হয়।
গয়নার মূল্য নির্ভর করে সেদিনের স্পট মূল্য, কারিগরি খরচ এবং প্রযোজ্য করের ওপর। স্পট মার্কেটের দামে সাধারণত দরকষাকষির সুযোগ থাকে না, তবে তৈরির খরচ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আলোচনা করা যায়। ক্রেতা যদি ওজন ও ক্যারেট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন, তাহলে মোট মূল্য সহজেই যাচাই করতে পারেন।
ইতিহাসে সোনার গুরুত্ব বহু পুরোনো। হাজার বছর ধরে এটি মুদ্রা, গয়না এবং সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে মানুষ সোনাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করে। একসময় সোনার মানের ভিত্তিতেই মুদ্রা চালু হতো। ১৮৩৪ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী যুক্তরাষ্ট্রে ২০ ডলারের বিনিময়ে এক আউন্স সোনা পাওয়া যেত। মহামন্দার সময় ১৯৩৩ সালে সোনার দাম বাড়িয়ে ৩৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়। পরে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করলে বাজারভিত্তিক দামের যুগ শুরু হয়।
গত এক দশকে সোনার দাম প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি আউন্স সোনার মূল্য ছিল ১ হাজার ২৫০ ডলার, যা বর্তমানে ৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে লন্ডন ও নিউইয়র্কের এক্সচেঞ্জে সোনার স্পট মূল্য মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বাজারে সেই মূল্য দেশীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয় ও চাহিদা অনুযায়ী প্রিমিয়াম। শুল্কনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে, ভারতে সোনার ওপর ৩ শতাংশ জিএসটি আরোপ করা হয়, তবে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনলে কর প্রযোজ্য নয়।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্বর্ণমুদ্রা ও বার তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ইগল, চীনের গোল্ড পান্ডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার করুগারর্যান্ড উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়িয়েছে, যা বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সোনা মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, পরিমাণ ৮ হাজার ১৩৩ টন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানি, তাদের মজুত ৩ হাজার ৩৫০ টন। তৃতীয় অবস্থানে ইতালি, যাদের কাছে রয়েছে ২ হাজার ৪৫১ টন সোনা।







Add comment