যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এক কিশোরীর বিরল মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার পরিবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছেছে। নির্বাসিত বাবা–মায়ের সঙ্গে মেক্সিকোতে পাঠানো ওই কিশোরীর বড় ভাই মঙ্গলবার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে উপস্থিত থাকছেন।
১৮ বছর বয়সী এই তরুণ টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গেছেন এবং নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যানের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তিনি কংগ্রেশনাল হিস্পানিক ককাসের অন্য অতিথিদের সঙ্গে যোগ দেবেন। তাদের লক্ষ্য, বর্তমান প্রশাসনের অভিবাসন নীতির প্রভাবে কীভাবে মার্কিন পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা তুলে ধরা।
ককাসের চেয়ারম্যান ও কংগ্রেসম্যান বলেন, বিষয়টি কেবল অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নিয়ে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার ভাষায়, এই নীতির প্রভাব সরাসরি মার্কিন নাগরিক শিশুদের ওপর পড়ছে।
১৮ বছর বয়সী এই তরুণ নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি পরিবারের টেক্সাসের বাড়িতে একা বসবাস করছেন। ওই দিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তার পাঁচ ভাইবোনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে চারজনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, যার মধ্যে রয়েছে ১১ বছর বয়সী বিরল মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত বোন। তাদের বাবা–মা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় পুরো পরিবারকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়।
পরিবারটির যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রচেষ্টা এখন এক সংকটময় পর্যায়ে। কারণ, মেক্সিকোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ায় কিশোরীর সুস্থতার অগ্রগতি থেমে গেছে। স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের আগে তরুণটি কংগ্রেসে গিয়ে পরিবারের ফিরে আসার আবেদন জানাচ্ছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি আশা করছেন, কর্তৃপক্ষ হয়তো বলবে পরিবারকে ফিরিয়ে আনা হোক। গত এক বছরকে তিনি বর্ণনা করেছেন গভীর একাকিত্বের সময় হিসেবে। তার কথায়, এটি যেন জীবন্ত কোনো চিহ্নহীন কফিনে আটকে থাকার মতো অনুভূতি। পরিবারকে শেষবার একসঙ্গে দেখার স্মৃতি মনে পড়লে তিনি কেঁদে ফেলেন বলেও জানান।
নিরাপত্তাজনিত কারণে গণমাধ্যম তার নাম প্রকাশ করছে না। পরিবারটি মেক্সিকোর এমন একটি এলাকায় অবস্থান করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অপহরণের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত জুনে পরিবারটি মানবিক কারণে প্যারোলের আবেদন করে, যাতে অনথিভুক্ত বাবা–মা ও এক অ-নাগরিক ভাইবোন অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে কিশোরীর চিকিৎসায় সহায়তা করতে পারেন। তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।
কংগ্রেসম্যান জানান, পরিবারটিকে ফেরানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি ও ককাসের কয়েকজন সদস্য প্যারোল আবেদনের সমর্থনে চিঠি দিয়েছেন। তার মতে, যাই ঘটুক না কেন, ১১ বছর বয়সী কিশোরীই এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
পরিবারটির দুর্ভোগ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, যখন তারা টেক্সাসে একটি বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টে আটক হন। হাসপাতালের পথে থাকা অবস্থায় বর্ডার পেট্রোল কর্মকর্তারা তাদের থামান। পরিবারের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে তারা একই চেকপয়েন্ট দিয়ে কোনো সমস্যা ছাড়াই যাতায়াত করেছেন এবং হাসপাতাল ও অভিবাসন আইনজীবীর চিঠিসহ শিশুদের জন্মসনদ দেখিয়েছেন। তবে এবার সেই নথিপত্র গ্রহণ করা হয়নি এবং পরদিনই তাদের বহিষ্কার করা হয়।
আইনজীবী বলেন, পরিবারটির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, বাবা–মাকে পূর্বে দ্রুত বহিষ্কার আদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তা অমান্য করলে পরিণতি ভোগ করতে হয়।
পরিবারকে মেক্সিকোতে পাঠানোর পর তরুণটি কলেজে যাওয়ার স্বপ্ন আপাতত স্থগিত করে দুটি চাকরি নেন। প্রতি দুই সপ্তাহে তিনি বোনের জন্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পাঠান। অতিরিক্ত কাজের চাপে কখনো কখনো খাওয়ার সময়ও পান না বলে জানান। বর্তমানে তিনি একটি পূর্ণকালীন চাকরিতে সীমাবদ্ধ আছেন।
তার ভাষায়, ছোট বোনের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা প্রয়োজন এবং তা কেবল তার বাবা–মাই দিতে পারেন। পরিবার একত্রিত হলে তিনি কলেজে গিয়ে নিউরোসার্জন হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চান। ২০২৪ সালে প্রথম মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারের সময় যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার বোনের জীবন রক্ষা করেছিলেন, সেই পেশাতেই যেতে চান তিনি।
এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের ভাষণে অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং বিদেশে বিদ্যমান হুমকি নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কার্যক্রম পুনরায় চালুর আহ্বান জানাবে।
কংগ্রেশনাল হিস্পানিক ককাস এক সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসন প্রয়োগসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, নাগরিক শিশুদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া একটি গভীর মানবিক সংকট, যার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।







Add comment