তিন অর্থনীতিবিদের এক সাধারণ আড্ডা থেকেই যে বহুবিলিয়ন ডলারের একটি শিল্পের সূচনা হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। ১৯৮৮ সালে আইওয়া সিটিতে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জন্ম নেয় যে ধারণা, তা আজকের বৈশ্বিক প্রেডিকশন মার্কেট শিল্পের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সেই সময় স্মার্টফোনে বসে নির্বাচন বা সুপার বোলের ফল নিয়ে বাজি ধরার সুযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক মধ্যাহ্নভোজের সময় আলোচনা করছিলেন, কেন জনমত জরিপ প্রায়ই নির্বাচনের ফলাফল ভুলভাবে পূর্বাভাস দেয় এবং এর বিকল্প কী হতে পারে। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে মিশিগান প্রাইমারিতে এক নাগরিক অধিকার নেতার অপ্রত্যাশিত জয়ের ঘটনা তাদের ভাবিয়ে তোলে, যেখানে জরিপে ভিন্ন পূর্বাভাস ছিল।
আলোচনার এক পর্যায়ে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যদি একটি বাজার তৈরি করা যায় যেখানে মানুষ ভবিষ্যৎ ঘটনার ওপর বিনিয়োগ করবে, তাহলে সেই বাজারের মূল্যই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ইঙ্গিত দেবে। কয়েক গ্লাস বিয়ারের আড্ডা শেষে তারা একটি ধারণায় একমত হন, ভবিষ্যৎ ঘটনার ফল নিয়ে চুক্তি কেনাবেচার একটি বাজার, যা পূর্বাভাসের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
এই ধারণা থেকেই ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ায় একটি পরীক্ষামূলক প্রেডিকশন মার্কেট গড়ে ওঠে। প্রথমে এটি ছিল একেবারেই ছোট পরিসরের উদ্যোগ। একটি খালি অফিসকক্ষে সার্ভার বসানো হয়, যেখানে দুজনের বসার জায়গাও ছিল সীমিত। বাজারটির নাম দেওয়া হয় “আইওয়া পলিটিক্যাল স্টক মার্কেট”। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, তারা যেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোন প্রার্থী কত শতাংশ ভোট পাবেন, সে বিষয়ে চুক্তি কেনাবেচা করেন।
তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটার সবার কাছে ছিল না। শিক্ষার্থীরা লেনদেন করতে কম্পিউটার ল্যাবে ভিড় জমাতেন। নির্বাচন দিবসে সেই ল্যাবগুলো উপচে পড়ত। ফলাফল ঘোষণার সময় দুই টেলিভিশন সেটের সামনে উদ্বিগ্ন অপেক্ষা ছিল উদ্যোক্তাদের। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, মাত্র ২০০ জনেরও কম অংশগ্রহণকারী থাকা সত্ত্বেও বাজারের পূর্বাভাস ছিল বিস্ময়করভাবে নির্ভুল। জনপ্রিয় ভোটের ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থী যে ৫৩.২ শতাংশ ভোট পাবেন, তা বাজার সঠিকভাবে ইঙ্গিত করেছিল। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর ভোট শেয়ারের পূর্বাভাসও ছিল প্রকৃত ফলাফলের মাত্র ০.২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে।
প্রথম বাজারে সর্বোচ্চ মুনাফা ছিল ১৩.৫৪ ডলার, ২৫০ ডলার বিনিয়োগে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র সাফল্যই ভবিষ্যতের বিশাল শিল্পের বীজ রোপণ করে। পরবর্তী নির্বাচনে এটি “আইওয়া ইলেকট্রনিক মার্কেটস” নামে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়, ফেডারেল কমোডিটি ফিউচারস ট্রেডিং কমিশনের অনুমোদনে। তবে শর্ত ছিল, এটি কেবল একাডেমিক ও পরীক্ষামূলক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে, বাইরের বিজ্ঞাপন থাকবে না এবং একজন বিনিয়োগকারী ৫০০ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করতে পারবেন না।
সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, নির্বাচনপূর্ব সময়ে এই বাজার অনেক শীর্ষ জরিপকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে নির্ভুলতায়। অর্থনীতি, রাজনীতি ও ব্যবসা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। যদিও নির্বাচনে বাজির প্রচলন উনিশ ও বিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে ছিল, কিন্তু এটিকে আধুনিক আর্থিক বিনিময় প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়ার ধারণা ছিল এক নতুন দিগন্ত।
এই একাডেমিক উদ্যোগ বেসরকারি খাতে এবং এমনকি প্রতিরক্ষা বিভাগেও বিভিন্ন প্রেডিকশন মার্কেট প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে ইন্টারনেট ও ক্রীড়া জুয়ার ওপর ফেডারেল আইনি বিধিনিষেধের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টেকেনি।
২০২০ সালে একটি প্ল্যাটফর্ম এবং পরের বছর আরেকটি প্ল্যাটফর্ম চালু হওয়ার পর তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর আপত্তির মুখে পড়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ফেডারেল আদালত শিল্পটির পক্ষে রায় দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়ন্ত্রকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে এবং বাণিজ্যিক প্রেডিকশন মার্কেটের প্রতি সহনশীলতা বাড়ে। একই সময়ে প্রেসিডেন্টের পুত্র একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারী ও আরেকটিতে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হন।
বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মগুলো সুপার বোলের ফল থেকে শুরু করে হাফটাইম শোতে কোন গান আগে গাওয়া হবে কিংবা ধারাভাষ্যে নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারিত হবে কি না, এমন বিষয়েও চুক্তি চালু করেছে। শুধু সুপার বোল রবিবারেই একটি প্ল্যাটফর্মে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। ফেডারেল পর্যায়ে প্রেডিকশন মার্কেটের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিধিমালা নেই, যা বাজার কারসাজি বা ভোক্তা সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার যত বড় ও প্রভাবশালী হবে, কারসাজির প্রলোভনও তত বাড়তে পারে। পাশাপাশি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিষয়ে জনসমক্ষে তথ্য সীমিত, সেখানে এসব বাজারের পূর্বাভাস তুলনামূলক কম নির্ভুল হতে পারে।
তারপরও সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, বাস্তব জগতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনাগুলোর পূর্বাভাসে প্রেডিকশন মার্কেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘ একাডেমিক পরীক্ষার পর যে ধারণা জন্ম নিয়েছিল, তা এখন বৈশ্বিক পরিসরে বিস্তৃত এক শিল্পে পরিণত হয়েছে।







Add comment