লন্ডনের আকাশে শীতের হালকা কুয়াশা বিরাজ করলেও রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলের ভেতর ছিল এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা। ৭৯তম ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কেবল সেরা সিনেমা বেছে নেওয়ার পর্বই ছিল না; বরং এটি সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্পন্দনের এক প্রতিফলন হিসেবেও দেখা গেছে।
এবারের আসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। মনোনয়নে এগিয়ে থাকা এই চলচ্চিত্রটি সেরা ছবি, সেরা পরিচালকসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কার জিতেছে এবং প্রায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। পরিচালক হিসেবে এই সিনেমাটি তৈরি করেছেন একজন অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র নির্মাতা, যার কাজ যুদ্ধ-পরবর্তী মানবিক টানাপোড়েনকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সঙ্গে দক্ষভাবে মিলিয়েছে। সমালোচক ও দর্শক উভয়ের কাছেই এটি প্রশংসিত হয়েছে।
সহ-অভিনেতা বিভাগে একই চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন একজন খ্যাতিমান অভিনেতা, যার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য বিতর্ক এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এটি তার জন্য নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
আরেকটি বড় আলোচিত ছবি ছিল ‘সিনার্স’, যা পরিচালনা করেছেন রায়ান কুগলার। এই চলচ্চিত্রটি জিতেছে তিনটি প্রধান পুরস্কার—সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য, পার্শ্ব অভিনেত্রী এবং মৌলিক সংগীত। এর মাধ্যমে পরিচালক বাফটার ইতিহাসে মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বিজয়ী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে সম্মান পেয়েছেন উনমি মোসাকু, এবং সংগীতে জাদু দেখিয়ে পুরস্কার জিতেছেন লুডভিগ গোরানসন।
সেরা অভিনেতা বিভাগে এই বছর চমক দেখা গেছে। অনুমিতভাবে জনপ্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে না থাকলেও, ‘আই সয়্যার’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেতা হয়েছে তরুণ রবার্ট অ্যারামায়ো। এই অর্জন অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন জেসি বাকলি, ‘হ্যামনেট’ সিনেমার জন্য। একই সঙ্গে ‘হ্যামনেট’ সেরা ব্রিটিশ ছবির খেতাবও জিতেছে।
অ-ইংরেজি ভাষার সেরা চলচ্চিত্র হয়েছে নরওয়ের ইয়োকিম ট্রিয়ারের ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’, যা মানবিক গল্প বলার গভীর শক্তি প্রতিফলিত করেছে। সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার গেছে ‘মিস্টার নোবডি এগেইনস্ট পুতিন’-কে, যা রাজনৈতিক পটভূমিতে ব্যক্তির অবস্থানকে কেন্দ্র করে নির্মিত এবং সমসাময়িক বাস্তবতার তীক্ষ্ণ প্রতিফলন তুলে ধরেছে।
অ্যানিমেশন বিভাগে সেরা হয়েছে ‘জুটোপিয়া ২’, আর শিশু ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের বিভাগে সম্মানিত হয়েছে ‘বং’।
কারিগরি বিভাগেও নজর কেড়েছে গিয়ের্মো দেল তোরের ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। প্রোডাকশন ডিজাইন, মেকআপ ও কস্টিউম ডিজাইনে সৃজনশীলতা আলাদা করে প্রশংসিত হয়েছে। ভিজ্যুয়াল এফেক্টসে পুরস্কার জিতেছে ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন অ্যালান কামিং, যার রসবোধপূর্ণ উপস্থাপনায় হাসির রোল তোলা হয়েছে এবং শিল্পীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনৈতিক উত্তাপ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের প্রশ্ন। এইভাবে বাফটা এবারও প্রমাণ করেছে, সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তার বহনকারী শক্তিশালী মাধ্যম।







Add comment