নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্রের বরফ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানকার তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বরফ কমে গেলেও স্বালবার্ড অঞ্চলের মেরু ভাল্লুক আগের তুলনায় বেশি হৃষ্টপুষ্ট ও সুস্থ অবস্থায় রয়েছে। যদিও গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে বলে মনে করার সুযোগ নেই।
তথ্য অনুযায়ী, আর্কটিক মহাসাগরের স্বালবার্ড ও রাশিয়ার নোভায়া জেমলিয়ার মধ্যবর্তী উত্তর বারেন্টস সাগরে তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় সাত গুণ দ্রুত বাড়ছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সমুদ্রের বরফে। শীত ও বসন্ত মৌসুমে আগে যেখানে দীর্ঘ সময় বরফ স্থায়ী থাকত, এখন সেখানে অন্তত দুই মাস কম সময় ধরে বরফ টিকে থাকে। ফলে মেরু ভাল্লুকদের শিকার ক্ষেত্র ও বরফের গুহায় পৌঁছাতে ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে।
নরওয়ের পোলার ইনস্টিটিউটের এক গবেষক জানিয়েছেন, উত্তর গোলার্ধে মেরু ভাল্লুক ২০টি স্বতন্ত্র জনসংখ্যায় বিভক্ত। আলাস্কা, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে এদের সংখ্যা কমে গেলেও বারেন্টস সাগর এলাকার জনসংখ্যা আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। এই স্থিতিশীলতা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে গবেষকদের।
১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ৭৭০টি মেরু ভাল্লুককে ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে অচেতন করে তাদের দৈর্ঘ্য ও ওজন পরিমাপ করা হয়। দীর্ঘ সময়ের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ সাল পর্যন্ত তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও ২০১৯ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে ওজন ও স্বাস্থ্য উন্নতির ধারায় ফিরে এসেছে। এই পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বসন্তকালে সিল বরফের ওপর বাচ্চা দেয়। এই সময় মেরু ভাল্লুক সিল শিকার করে শরীরে চর্বি জমা করে রাখে, যা তাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের ধারণা, বরফের বিস্তৃতি কমে যাওয়ায় সিলের অবস্থান চিহ্নিত করা এখন তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে গেছে। ফলে শিকার করতে ভাল্লুকদের কম পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বরফ সরে গেলে কিছু ভাল্লুক দ্বীপেই অবস্থান করছে এবং হারবার সিল শিকার করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখন তারা হাঁস ও রাজহাঁসের ডিম খুঁজে খাচ্ছে। এমনকি দ্বীপে বল্গা হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোকেও তাড়া করে শিকার করতে দেখা গেছে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই ইতিবাচক চিত্র দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। নেদারল্যান্ডসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক জানিয়েছেন, সমুদ্রের বরফ যদি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়, তবে মেরু ভাল্লুকের একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল জনসংখ্যা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে নরওয়ের সংশ্লিষ্ট গবেষকও বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাল্লুকদের স্বাস্থ্য ভালো থাকলেও এর একটি সীমা রয়েছে। সমুদ্রের বরফ যদি একই হারে গলতে থাকে, তবে স্বালবার্ড অঞ্চলের মেরু ভাল্লুক শিগগিরই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্বালবার্ডের মেরু ভাল্লুকদের বর্তমান সুস্থতা একদিকে যেমন বিস্ময়কর, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বরফের পরিমাণ কমলেও সাময়িকভাবে তারা অভিযোজনের সক্ষমতা দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।







Add comment