একটি সন্তানের জীবনে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি নিরাপত্তা, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও নীরব দিকনির্দেশনার প্রতীক। কিন্তু শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার পথে সন্তানের চোখে বাবার অবস্থান ও ভূমিকা কীভাবে বদলায়, সে প্রশ্ন অনেক সময়ই অনালোচিত থেকে যায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়, অনুভূতির গভীরতা বদলায়, আর বাবার আচরণ সন্তানের মানসিক গঠনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
০ থেকে ২ বছর বয়সে শিশুর কাছে বাবা মানেই নিরাপদ আশ্রয়। এ সময় তারা শুধু শব্দ বোঝে না, তারা স্পর্শ, কণ্ঠস্বর ও সান্নিধ্য অনুভব করে। বাবার কোল তাদের কাছে প্রশান্তির জায়গা হয়ে ওঠে। বাবার কণ্ঠ শুনে কান্না থেমে যাওয়া কিংবা কাছে থাকলে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়া এই বয়সের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এখানে শিশুরা শেখে বিশ্বাস, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার মৌলিক অনুভূতি। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি শেষে বাবা কীভাবে সন্তানের কাছে যান, আদর করেন নাকি দূরে থাকেন, এসব আচরণ তাদের মনে নীরবে জায়গা করে নেয়। এই সময় দূরত্ব, শীতলতা বা সব দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া সন্তানের নিরাপত্তাবোধে প্রভাব ফেলতে পারে। এ পর্যায়ে উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় উপহার।
৩ থেকে ৫ বছর বয়সে বাবাই সন্তানের চোখে নায়ক। সবচেয়ে শক্তিশালী, সাহসী ও মজার মানুষ হিসেবে বাবাকে দেখা শুরু হয়। কাজ থেকে ফিরে কিছুটা সময় দেওয়া, কোলে নেওয়া, খেলায় সঙ্গ দেওয়া বা মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া ছোট কাজগুলো শিশুর কাছে বিশাল আনন্দের। এ বয়সে তারা লক্ষ্য করে, ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ পায়। বাবা পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, ভয় পেলে পাশে দাঁড়ান কি না, রাগের সময় কোন ভাষা ব্যবহার করেন, সবকিছুই তাদের মনে গেঁথে যায়। চিৎকার, উপহাস বা অপমানজনক মন্তব্য শিশুর মনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। যদি বাবা নিজেই ভয়ের কারণ হয়ে ওঠেন, তাহলে শিশুর মনে ভালোবাসা ও কষ্টের মধ্যে একধরনের বিভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
৬ থেকে ৯ বছর বয়সে বাবা হয়ে ওঠেন শিক্ষক। সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার, চাপের সময় নিজেকে সামলানোর কৌশল সবই শিশুর কাছে শিক্ষার উপাদান। তারা কথার চেয়ে কাজ বেশি দেখে। দৈনন্দিন আচরণ, ভুল হলে সংশোধনের পদ্ধতি, অন্যের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার সবকিছুই তাদের শেখার অংশ। এই সময় তাদের ছোট করা, প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া বা দুশ্চিন্তাকে গুরুত্বহীন বলা আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে।
১০ থেকে ১২ বছর বয়সে বাবা হয়ে ওঠেন রক্ষক। পৃথিবীকে তখন অনেক বড় ও কখনো কখনো ভীতিকর মনে হয়। সন্তান খেয়াল করে, বাবা সত্যিই মন দিয়ে শুনছেন কি না। “আমি তোমার সঙ্গে আছি” এই আশ্বাস তাদের জন্য নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অনুভূতিকে অবজ্ঞা করলে বা কষ্টকে অস্বীকার করলে শিশুর মনে চাপা কষ্ট জমে থাকতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে।
১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সে বাবা পথপ্রদর্শক। এ সময় কিশোরেরা নিজের পরিচয় গড়তে চায়, ফলে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাবার কথাবার্তা, আচরণ ও জীবনযাপন তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। রাগ নিয়ন্ত্রণ, সম্মান প্রদর্শন, সীমা নির্ধারণ এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়ার মতো বিষয়গুলো তারা বাবার কাছ থেকেই শেখে। পরিবারে আবেগগত সংযোগ না থাকলে তারা সেই সংযোগ বাইরে খুঁজতে পারে, যা সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই অবিরত সমালোচনার বদলে বোঝাপড়া ও সংযোগ বজায় রাখা জরুরি।
১৭ থেকে ২০ বছর বয়সে সন্তান নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। পড়াশোনা, পেশা ও সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গিয়ে বাবার শেখানো মূল্যবোধ ও গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি তাদের পথ দেখায়। তারা লক্ষ্য করে, আবেগ প্রকাশ করা দুর্বলতা নয় এবং সম্মান অর্জনের বিষয়। বাবা ভুল করলে তা স্বীকার করার ভঙ্গিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দিকনির্দেশনা ও সমর্থন এ সময় বেশি প্রয়োজন।
২০ থেকে ২৫ বছর বয়সে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। বাবা আর নিখুঁত নন, কিন্তু প্রয়োজনীয় মানুষ হিসেবেই থাকেন। কঠিন সময়ে তাঁর অবস্থান, শর্তহীন ভালোবাসা ও ক্ষমার মানসিকতা তখন মূল্য পায়। স্পষ্টভাবে ভালোবাসা ও গর্ব প্রকাশ করা এই বয়সে সম্পর্ককে দৃঢ় করে। ভুল বোঝাবুঝি হলে তা মেরামতের সাহস দেখানো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। মনে রাখা দরকার, সম্পর্ক সারানোর সময় ফুরিয়ে যায় না এবং সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কখনো দেরি হয় না।







Add comment