২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। চতুর্থ প্রান্তিকে অর্থনীতি বার্ষিক ভিত্তিতে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় বড় ধরনের মন্থরতা নির্দেশ করে। ঐতিহাসিক সরকারি শাটডাউনের প্রভাব অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করায় বছরজুড়ে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মহামারির পর এটিই সবচেয়ে ধীরগতির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কিত সর্বনিম্ন অবস্থায় পৌঁছায়নি। গত বসন্তে প্রেসিডেন্টের ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর যে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শুল্ক, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং গ্রেট রিসেশনের পর সবচেয়ে দুর্বল চাকরি সৃষ্টির সময়কাল সত্ত্বেও ২০২৫ সালে অর্থনীতি মোটের ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এতে উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের ধারাবাহিক ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুক্রবার বাণিজ্য বিভাগ জানায়, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি মৌসুমি ও মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর বার্ষিক ১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টসেট পরিচালিত জরিপে অর্থনীতিবিদরা ১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, যা বাস্তব ফলাফলের চেয়ে বেশি।
পুরো ২০২৫ সালে অর্থনীতি ২ দশমিক ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২০ সালের পর সবচেয়ে কম।
উলফ রিসার্চের প্রধান অর্থনীতিবিদ সিএনএনকে বলেন, শ্রম সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পরও গত বছরের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। তাঁর ভাষায়, একে ‘গোল্ডিলক্স’ পরিস্থিতি বলা যেতে পারে।
শেষ প্রান্তিকে কী ঘটেছে
সরকারি শাটডাউনের কারণে ফেডারেল ব্যয় কমে যাওয়ায় চতুর্থ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি থেকে ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এ ক্ষতির বড় অংশ চলতি বছরের শুরুতে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
পণ্য ক্রয়ে ভোক্তাদের কিছুটা সংযমও প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে। সরকারি শাটডাউনের কারণে চতুর্থ প্রান্তিকের তথ্য প্রকাশ এক মাস বিলম্বিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ভোক্তা ব্যয় চতুর্থ প্রান্তিকে বার্ষিক ১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২৫ সালের শুরুর পর সবচেয়ে দুর্বল গতি। গত এক বছরে আয়ের স্তরভেদে ব্যয়ে বৈষম্য স্পষ্ট হয়েছে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী বাড়তে থাকা ঋণের চাপ, শ্লথ শ্রমবাজার এবং কয়েক বছরের সঞ্চিত মূল্যস্ফীতির কারণে চাপে পড়েছে।
ডয়চে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ মার্কিন অর্থনীতিবিদ বলেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির কর সুবিধা শেষ হওয়ার আগে অনেকেই নতুন গাড়ি কেনায় ব্যয় করায় বছরের শেষ প্রান্তিকে ব্যয় কিছুটা কমবে, তা প্রত্যাশিত ছিল। তবে তিনি মনে করেন, কর ফেরতের প্রভাবে বছরের প্রথম দিকে ভোক্তা ব্যয় আবার গতি পাবে এবং আসন্ন বড় ধরনের ভোক্তা মন্দার ইঙ্গিত নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে আয় বৈষম্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক মনোভাব আরও নেতিবাচক হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পৃথক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কলেজ ডিগ্রি ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে ভোক্তা আস্থা বেড়েছে, বিপরীতে এ সুবিধা নেই এমনদের মধ্যে আস্থা কমেছে। জরিপ পরিচালক জানান, বড় শেয়ারধারীদের মধ্যে মাসওয়ারি আস্থার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হলেও শেয়ারবিহীন ভোক্তাদের আস্থা হ্রাস সেই বৃদ্ধিকে পুরোপুরি সমন্বয় করেছে। আয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও একই বিভাজন দেখা গেছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়িক ব্যয় চতুর্থ প্রান্তিকে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের তিন মাসে ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যয় ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
আয়, সঞ্চয় ও মূল্যস্ফীতি
বাণিজ্য বিভাগের আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে ভোক্তা ব্যয় ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর এ বৃদ্ধি দাঁড়ায় মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যক্তিগত আয় মাসে ০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যার একটি অংশ মাউই দাবানল ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রদত্ত বড় অঙ্কের সমঝোতা অর্থের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ব্যক্তিগত আয় কার্যত স্থির ছিল।
কর-পরবর্তী আয়ের অনুপাতে সঞ্চয়ের হার নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে, যা অক্টোবর ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন।
ফেডারেল রিজার্ভের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক বেড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থেকে আরও দূরে সরে গেছে এবং মার্চ ২০২৪ সালের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক হার। পণ্য সংশ্লিষ্ট মূল্যবৃদ্ধি মাসিক ০ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। আমদানিকৃত পণ্যে আরোপিত উচ্চ শুল্কের ফলে আসবাবপত্র, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ও খেলনার মতো কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের অস্থির মূল্য বাদ দিলে মূল পিসিই সূচক মাসিক ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে বার্ষিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।







Add comment