Bp News USA

ফেডারেল অভিযানের পর রমজানে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় মুসলিম কমিউনিটি

ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে এলেও মিনিয়াপোলিসের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে এখনো রয়ে গেছে অস্থিরতা ও শঙ্কা। তবে সামনে আসন্ন পবিত্র রমজানকে ঘিরে তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুপরিচিত শপিং মল, যা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এক ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীর মালিকানায় রয়েছে, সেখানে চলছে ব্যস্ত প্রস্তুতি। স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়, রান্নাঘরের তদারকি এবং কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে তার কণ্ঠে স্পষ্ট দায়বদ্ধতার সুর। প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি টুইন সিটিজের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বড় পরিসরে ইফতার আয়োজন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ফেডারেল অভিযানের অভিঘাতের পর।

তিনি জানান, কেবল মালিক হিসেবে নয়, বরং সম্প্রদায়ের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি ভাড়াটিয়াদের মধ্যে ভয়, হতাশা ও ক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শত শত মানুষ প্রতিবছর এই আয়োজনে অংশ নেন। মিনিয়াপোলিসের মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষত সোমালি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে মলটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তিনি মনে করেন, এবারের ইফতার আয়োজন মানসিক পুনরুদ্ধার ও মনোবল বৃদ্ধির একটি নৈতিক দায়িত্ব।

রমজান ইসলামি বর্ষপঞ্জির নবম মাস। উত্তর আমেরিকায় বুধবার থেকে শুরু হওয়া প্রায় ৩০ দিনের এই সময়ে মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও সামাজিক সংহতির এই মাসে একত্রিত হয়ে ইফতার, নামাজ ও পারস্পরিক সহায়তার চর্চা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

কিন্তু গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের উদ্যোগে মিনেসোটায় শুরু হওয়া অভিবাসন অভিযান পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। অপারেশন মেট্রো সার্জ নামে পরিচালিত ওই অভিযানে প্রায় তিন হাজার অভিবাসন কর্মকর্তা অংশ নেন। ১ ডিসেম্বর থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার হাজারের বেশি অনিবন্ধিত অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে। অভিযানের সময় দুজন মার্কিন নাগরিক নিহত হন এবং সশস্ত্র ও মুখোশধারী কর্মকর্তাদের কঠোর কৌশল স্থানীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

দার আল-ফারুক ইসলামিক সেন্টারের এক কমিউনিটি সংগঠক বলেন, পুরো সরকারি যন্ত্র যখন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তখন তার মানসিক চাপ কল্পনার বাইরে। তার মতে, এই পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

মিনিয়াপোলিসে বর্তমানে এক লক্ষের বেশি মুসলমান বসবাস করেন, এবং শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা এই শহরের অংশ। ২০০৬ সালে শহরটি প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য নির্বাচন করে এবং ২০২৩ সালে প্রতিদিন পাঁচবার আজান সম্প্রচারের অনুমতি দিয়ে আরেকটি নজির স্থাপন করে। তবে সাম্প্রতিক ফেডারেল পদক্ষেপ ও প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

ব্যবসায়ীটি জানান, তিনি মুসলিম এবং মিনেসোটান—দুই পরিচয় নিয়েই গর্বিত। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস সৌভাগ্যের হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশ মানুষকে নিজেদের আমেরিকান পরিচয় নিয়েও সংশয়ে ফেলছে।

অভিযান শুরুর পর থেকে মুসলিম ও বিশেষ করে সোমালি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। কাজ, বাজার কিংবা মসজিদে যাওয়া—সব ক্ষেত্রেই ভয় কাজ করেছে। রেস্টুরেন্ট, দোকান ও মসজিদে লোকসমাগম কমে গিয়ে অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। এক ইয়েমেনি কফি শপ চেইনের সহমালিক জানান, তাদের বিক্রির অন্তত ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই এলাকায় তার আরেকটি রেস্তোরাঁও একই সংকটে পড়েছে।

উল্লেখিত শপিং মলটিতেও ৭১০টি দোকান ও বিক্রেতা রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সোমালি। প্রতিদিনের অভিযানের কারণে মলজুড়ে আইসিইবিরোধী পোস্টার দেখা যায়। বিক্রি কমে যাওয়ায় ভাড়ার মাত্র ৩৫ শতাংশ আদায় সম্ভব হয়েছে, যা চার লাখ ডলারের বেশি ক্ষতির সমান বলে কোম্পানির তথ্য।

মসজিদগুলোর উপস্থিতিও কমে যায়। দার আল-ফারুকে নামাজে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা হ্রাস পায় এবং অনেক উপাসক আটক হওয়ার আশঙ্কায় দূরে থাকেন। কমিউনিটির সদস্যদের পাসপোর্ট বা অভিবাসন কাগজপত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। মলের নামাজকক্ষেও উপস্থিতি অর্ধেকের কমে নেমে আসে।

তবে এখন রমজানকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। সীমান্তবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শীর্ষ কর্মকর্তা সম্প্রতি ঘোষণা দেন যে মিনেসোটায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযান শেষ হচ্ছে। এতে অনেকে সতর্ক আশাবাদী হয়েছেন।

ইসলামিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ রমজান উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, উন্নত নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। কফি শপ চেইনটি রমজানে সময়সীমা বাড়িয়ে ইফতার ও প্রশ্নোত্তর আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে, যাতে ভুল ধারণা দূর হয় এবং ভীতি কমে।

অমুসলিম ধর্মীয় নেতারাও সংহতি প্রকাশে উদ্যোগ নিয়েছেন। লন সাইন, কমিউনিটি ডিনার এবং জুমার নামাজে নজরদারির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে এ বছর রমজান ও লেন্ট একই সময়ে হওয়ায় আন্তধর্মীয় সহযোগিতা জোরদার হয়েছে।

তবে কেবল আধ্যাত্মিক শক্তিই পুনরুদ্ধারের পথ সহজ করবে না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার দাবি উঠেছে। গত সপ্তাহে মিনেসোটার গভর্নর ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এককালীন ১ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা প্রস্তাব করেছেন।

সম্প্রদায়ের নেতারা মনে করিয়ে দেন, যাঁরা আটক রয়েছেন, তাঁদের অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। গত রমজানে যারা একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন, এ বছর তাঁদের কেউ কেউ অনুপস্থিত। তাদের দ্রুত পরিবারে ও রাজ্যে ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা রয়েছে।

এদিকে ব্যবসায়ীটি জানান, তিনি দ্বিতীয় একটি রমজান ভোজের পরিকল্পনাও করছেন—সেসব মিনেসোটানদের জন্য, যারা শীত উপেক্ষা করে অভিবাসী সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার ভাষায়, মিনেসোটানরা উদার হৃদয়ের মানুষ এবং তাদের সমর্থন অনন্য।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed