যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অবস্থায় থাকা সঙ্গীদের কারণে অনেক মার্কিন নাগরিককে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কেউ কেউ দেশে থেকে প্রিয়জনের গ্রেপ্তারের আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য মেক্সিকোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন আলাদা আলাদা দেশে বসবাস করতে।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া এক মার্কিন নারী গত তিন মাস ধরে মেক্সিকোর পুয়েবলা শহরে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। আগে তিনি নিউইয়র্কের মিডলটাউনে একটি ডিনারে ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করতেন এবং ব্যস্ত সামাজিক জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মেক্সিকোতে এসে তার জীবন অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। গাড়ি না থাকা এবং স্প্যানিশ ভাষায় সীমিত দক্ষতার কারণে তিনি আগের মতো চলাফেরা করতে পারছেন না।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনথিভুক্ত অভিবাসন দমনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক পরিবার স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ার পথ বেছে নিচ্ছে। অনেকেই তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে মেক্সিকোতে বসবাস শুরু করেছেন।
অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করা একটি অলাভজনক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৫ লাখ নাগরিক এমন সম্পর্কের মধ্যে আছেন যেখানে দম্পতির একজনের অভিবাসন অবস্থান বৈধ নয়। এই কারণে অনেক পরিবার বিচ্ছেদের ঝুঁকিতে রয়েছে অথবা প্রিয়জনকে হারানোর ভয় নিয়ে বসবাস করছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা থাকে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যেকোনো সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। দ্বিতীয়ত, মেক্সিকোতে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করা। তৃতীয়ত, আলাদা দেশে বসবাস করা।
পুয়েবলাতে বসবাস করা ওই নারী জানান, স্বামীর নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে মেক্সিকোতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইনগত দিক থেকেও এটি তুলনামূলক সহজ ছিল। কারণ মেক্সিকোর নাগরিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে প্রথমে অস্থায়ী এবং পরে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়।
তবে এই সিদ্ধান্তের জন্য তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে জমানো ব্যক্তিগত অনেক জিনিসপত্র ফেলে আসতে হয়েছে। তবুও তিনি মনে করেন স্বামীর নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। অনেক সময় একাকীত্ব অনুভব করেন। যদিও স্বামী পাশে আছেন, তবু বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত পরিবেশের অভাব অনুভূত হয়।
এই দম্পতির পরিচয় হয়েছিল প্রায় ১৮ বছর আগে একটি বারে নাচের আমন্ত্রণের মাধ্যমে। পরে সম্পর্ক গভীর হলে স্বামী তাকে জানান, অসুস্থ বাবা-মায়ের সহায়তার জন্য তিনি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। একাধিকবার সীমান্ত পার হওয়ায় আইনি নিয়ম অনুযায়ী তার যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
দম্পতি একসময় বিষয়টি সমাধানের জন্য আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অনেক বছর তারা স্বাভাবিকভাবেই জীবন কাটিয়েছেন। পরিস্থিতি বদলে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়। তখন থেকে স্বামীর বাইরে যাওয়া নিয়ে তিনি সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতেন।
মেক্সিকো সিটিতেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরেক মার্কিন নারী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট থেকে তার সঙ্গীর সঙ্গে গত আগস্টে মেক্সিকোতে চলে আসেন। তাদের পরিচয় হয়েছিল একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে।
প্রথমদিকে তিনি জানতেন না যে তার সঙ্গী অনথিভুক্ত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। পরে তিনি জানতে পারেন যে একটি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সঙ্গীটি সেখানে থেকে গিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকও করেছিল।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন আদালত তাকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এর পর থেকে দুজনের জীবন চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নেন মেক্সিকোতে গিয়ে একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবেন।
এদিকে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার এক মার্কিন নারী বর্তমানে তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী থেকে আলাদা হয়ে বসবাস করছেন। তার সঙ্গীকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করে পরে মেক্সিকোতে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এবং তার সঙ্গী মেক্সিকোর ভেরাক্রুজে বসবাস করছেন।
এই দম্পতির সম্পর্ক প্রায় দুই দশকের। ওই নারী জানান, তার সঙ্গী পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন এবং সন্তানদের দেখাশোনাতেও বড় ভূমিকা ছিল। এখন পরিবারে সেই শূন্যতা স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রায় ২২ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসী স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে গেছেন। একই সময়ে ব্যাপক সংখ্যক অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বর্তমান আইনে যারা দীর্ঘ সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন, তারা সাধারণত এক দশক পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারেন না, এমনকি যদি তারা মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য একটি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে পরিবার বিচ্ছেদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিচারকদের সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে আইনটি এখনো অগ্রসর হয়নি। ফলে অনেক পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কেউ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে মেক্সিকোতে নতুন জীবন শুরু করছেন, আবার কেউ প্রিয়জন থেকে দূরে থেকেই দিন কাটাচ্ছেন।





Add comment