পরিবেশদূষণ, অনিয়মিত জীবনযাপন, রাত জাগা কিংবা হঠাৎ হওয়া ব্রণ—প্রতিদিনের এসব চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলে ত্বকের ওপর। বাইরে থেকে নানা প্রসাধনী ব্যবহার করলেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। কারণ সুস্থ ও উজ্জ্বল ত্বকের ভিত্তি তৈরি হয় শরীরের ভেতর থেকেই। সেই ভেতরের যত্নের সহজ এবং প্রাকৃতিক উপায় হতে পারে প্রতিদিনের এক কাপ চা।
চকচকে ও দাগহীন ত্বকের জন্য বাজারজুড়ে রয়েছে অসংখ্য সিরাম, ক্রিম ও ট্রিটমেন্ট। অনেকেই এসব পণ্যের পেছনে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু ত্বকের যত্নের আসল সূত্রটি অনেক সময় লুকিয়ে থাকে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে এবং রান্নাঘরের সাধারণ উপকরণে। ঠিক সেই জায়গাতেই গুরুত্ব পাচ্ছে চা। সাম্প্রতিক সময়ে সৌন্দর্যচর্চায় একটি পরিচিত শব্দ হয়ে উঠেছে ‘গ্লো টি’। এটি এমন কিছু ভেষজ ও ফুলের চা, যা নিয়মিত পান করলে ত্বকের স্বাস্থ্য ভেতর থেকে উন্নত করতে সহায়তা করে।
সিরাম ও বোতলজাত পণ্যের ভিড়ের মধ্যেও নীরবে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে এই চা। স্বাদে আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি এগুলো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও প্রাকৃতিক উপাদানে ভরপুর, যা ত্বকের নিস্তেজ ভাব কাটিয়ে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা আনতে সাহায্য করে।
মাচা চা
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত চাগুলোর একটি হলো মাচা। এই চা ইজিসিজি নামের শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা ত্বকের বয়সের আগাম ছাপ, ব্রণ এবং নিষ্প্রাণ ভাব কমাতে সহায়ক। মাচায় থাকা ক্যাটেচিন দূষণ ও অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। ক্লোরোফিল উপাদান ত্বক ডিটক্স করতে সাহায্য করে এবং দাগ হালকা করতে ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক ক্যাফেইন রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে ত্বকে স্বাস্থ্যকর উজ্জ্বলতা এনে দেয়। বিশেষ করে তেলতেলে ও ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য এটি কার্যকর।
জবা ফুলের চা
জবা ফুল দিয়ে তৈরি চা ত্বকের টানটান ভাব ধরে রাখতে পরিচিত। এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন ও ভিটামিন সি কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক এএইচএ ত্বকের ভেতর থেকে হালকা এক্সফোলিয়েশনের কাজ করে, ফলে পিগমেন্টেশন ও নিস্তেজ ভাব কমে। জবার মিউসিলেজ উপাদান ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা শুষ্ক ত্বকের জন্য বিশেষ উপকারী।
নীল অপরাজিতার চা
নীল অপরাজিতা ফুল দিয়ে তৈরি এই চা শুধু রঙের জন্য নয়, উপকারিতার দিক থেকেও বেশ কার্যকর। এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন ত্বকের বলিরেখা কমাতে সহায়তা করে এবং কোলাজেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। শুষ্ক ও ক্লান্ত ত্বকে আর্দ্রতা যোগ করার পাশাপাশি এটি কালো দাগ হালকা করতেও সহায়ক। অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে চুলের স্বাস্থ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ক্যামোমাইল চা
বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই চা মূলত ঘুমের সহায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হলেও ত্বকের যত্নেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামোমাইলের প্রদাহরোধী উপাদান ত্বকের লালচে ভাব কমায় এবং সংবেদনশীল ত্বকে আরাম দেয়। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ ব্রণ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। পাশাপাশি ভালো ঘুম নিশ্চিত হওয়ায় চোখের ফোলা ভাব ও কালো দাগ কমে, যা সামগ্রিকভাবে ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
গোলাপ চা
গোলাপজল যেমন ত্বকের জন্য পরিচিত, তেমনি গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি চা ভেতর থেকে আরও গভীরভাবে কাজ করে। এতে থাকা ভিটামিন সি কোলাজেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং ভিটামিন ই ত্বককে নরম ও মসৃণ রাখে। গোলাপ চা ত্বকের জ্বালা কমাতে, পোরস টাইট করতে এবং অতিরিক্ত তেল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এটি বেশ উপযোগী।
তুলসী ও আদা চা
আয়ুর্বেদে বহুল ব্যবহৃত তুলসী ও আদার সংমিশ্রণ ত্বকের জন্য ভেতর থেকে কাজ করে। তুলসী পরিবেশগত চাপ থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেয় এবং আদা রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা এনে দেয়। এই চা শরীর ডিটক্স করতে সাহায্য করে এবং ব্রণ কমাতে সহায়ক, বিশেষ করে শীতকালে যখন ত্বক বেশি নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
নিয়মিত এসব চা পান করা ত্বকের যত্নে একটি সহজ ও প্রাকৃতিক অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে। বাইরে থেকে যত প্রসাধনীই ব্যবহার করা হোক না কেন, ভেতরের যত্ন নিশ্চিত হলে ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য অনেক বেশি স্থায়ী হয়।







Add comment