ব্যস্ত ও দ্রুতগতির আধুনিক জীবনে সময় বাঁচানোর তাগিদে অনেকেই প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বেছে নিচ্ছেন। বিস্কুট, চিপস, বোতলজাত সস, ফলের জুস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস কিংবা প্রক্রিয়াজাত মাংস এখন ঘরে ঘরে পরিচিত। এসব খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখতে, স্বাদ ও রং ধরে রাখতে এবং জীবাণুর বৃদ্ধি ঠেকাতে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সাম্প্রতিক গবেষণার পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল ও ম্যাডস্ক্যাপে প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে পরিচালিত একটি বৃহৎ গবেষণায় এক লাখের বেশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষণার লক্ষ্য ছিল নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নির্ণয় করা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাঁরা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও নির্দিষ্ট সংরক্ষণকারী উপাদান গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে ক্যানসার ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘ সময় ধরে এসব খাবারের ওপর নির্ভরতার ফলেই ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা
গবেষণায় উঠে এসেছে, সব সংরক্ষণকারী উপাদান সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে কয়েকটি উপাদান বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম নাইট্রাইট ও নাইট্রেট, যা সাধারণত সসেজ, বেকনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উপাদানগুলোর সঙ্গে প্রোস্টেট ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে ব্যবহৃত পটাশিয়াম সরবেট ও সালফাইটের ক্ষেত্রেও সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। এসব উপাদান সামগ্রিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য হলেও বাড়াতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব খাবারে এসব সংরক্ষণকারী উপাদান থাকে, সেগুলো সাধারণত পুষ্টিগুণে দরিদ্র হয়। এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে, যা স্বাস্থ্যের ওপর আলাদা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ক্যানসারের ঝুঁকির পেছনে শুধু উপাদান নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাসই ভূমিকা রাখে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
একই ধরনের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বেশি মাত্রায় সংরক্ষণকারী উপাদান গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে পটাশিয়াম সরবেট, ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট এবং অ্যাসটিক অ্যাসিডের মতো উপাদানের সঙ্গে এই ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব উপাদান শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমাতে পারে এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের প্রভাব চলতে থাকলে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পুরোপুরি বাদ দেওয়া কি সম্ভব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্যগুলো শুনে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। গবেষণার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং সচেতন করা। খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান ছাড়া আধুনিক খাদ্যব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়বে। তবে সচেতন কিছু অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
আলট্রা প্রসেসড খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ঘরে রান্না করা টাটকা ও মৌসুমি খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। কেনাকাটার সময় খাবারের প্যাকেটে লেখা উপাদানগুলো পড়ে দেখলে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত মাংসের ব্যবহার সীমিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত জীবনযাপন এবং সচেতন খাদ্য নির্বাচনই ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





Add comment