পৃথিবীর অভিমুখে ধেয়ে আসছে হাজার হাজার শহর ধ্বংসে সক্ষম গ্রহাণু, আর সেগুলো প্রতিহত করার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্ল্যানেটারি ডিফেন্স অফিসার। তাঁর এই মন্তব্য বিজ্ঞানী মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফিনিক্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় ২৫ হাজার গ্রহাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, যেগুলোর প্রত্যেকটির আকার কমপক্ষে ১৪০ মিটার বা তার বেশি। এই মাপের একটি গ্রহাণু যদি পৃথিবীতে আঘাত হানে, তাহলে অঞ্চলভেদে তা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, এমন প্রায় ১৫ হাজার গ্রহাণু এখনো শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছে।
মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৪০ মিটার বা তার বেশি ব্যাসের যেকোনো মহাজাগতিক বস্তুকে শহর বিধ্বংসী গ্রহাণু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো সাধারণ বড় টেলিস্কোপে সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো শক্তি বহন করে। তুলনামূলকভাবে বড় আকারের, গ্রহ পর্যায়ের ধ্বংস ডেকে আনতে সক্ষম গ্রহাণুগুলো ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং সেগুলোর ওপর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মাঝারি আকারের বিপজ্জনক গ্রহাণুগুলোর বড় অংশ এখনো অদৃশ্য রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্রহাণুগুলোর বেশিরভাগই অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং কম প্রতিফলনশীল। ফলে মহাকাশের বিস্তীর্ণ অন্ধকার পটভূমিতে এগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু গ্রহাণু আবার পৃথিবীর কক্ষপথ ঘেঁষে বা অনুরূপ পথে চলাচল করে, যার কারণে খুব কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত সেগুলো চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় যেকোনো সময় বিনা পূর্ব সতর্কবার্তায় কোনো গ্রহাণুর আঘাত হানার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
২০২২ সালে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ডার্ট মিশনের মাধ্যমে একটি ছোট গ্রহাণুর গতিপথ সামান্য পরিবর্তনে সফল হয়। ওই মিশনকে গ্রহাণু প্রতিরোধ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হলে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে কয়েক বছর আগেই নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে হয়। কিন্তু যে প্রায় ১৫ হাজার গ্রহাণু এখনো শনাক্তই হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এমন পূর্ব প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়া কঠিন।
সংস্থার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, যদি হঠাৎ করে বিপজ্জনক কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে প্রতিহত করার মতো প্রস্তুত মহাকাশযান বর্তমানে পৃথিবীতে নেই। অর্থাৎ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয় এবং সময়সাপেক্ষ প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে আশার কিছু দিকও রয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নিয়ার আর্থ অবজেক্ট সার্ভেয়ার নামে একটি নতুন মিশন নিয়ে কাজ করছে। এটি একটি ইনফ্রারেড স্পেস টেলিস্কোপ, যা বিশেষভাবে অন্ধকার ও কম প্রতিফলনশীল গ্রহাণুর তাপীয় স্বাক্ষর শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এখনো অদৃশ্য থাকা বিপজ্জনক গ্রহাণুগুলো শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আধুনিক গ্রাউন্ডভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে। ভেরা সি রুবিন অবজারভেটরির মতো উন্নত মানের জরিপ কার্যক্রম ভবিষ্যতে সম্ভাব্য গ্রহাণু হুমকি সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
বিশ্বজুড়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা একমত যে, গ্রহাণু হুমকি এখনো তাত্ত্বিক আশঙ্কার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও অশনিসংকেত পুরোপুরি কাটেনি। শনাক্তকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিরোধ প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।







Add comment