মহাকাশের গ্রহগুলোকে আমরা প্রায়ই স্থির ও চিরন্তন সত্তা হিসেবে কল্পনা করি। বাস্তবে তবে প্রতিটি গ্রহেরই একটি সূচনা, বিবর্তন ও সমাপ্তি আছে। মহাজাগতিক ধূলিকণা, গ্যাস ও প্রবল সংঘর্ষের ভেতর থেকেই তাদের জন্ম। সময়ের সঙ্গে তারা আকারে বড় হয়, গঠনগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিণত অবস্থায় পৌঁছে এবং একসময় অবক্ষয়ের পথে হাঁটে। কোনো কোনো গ্রহ অবিশ্বাস্য দীর্ঘ সময় টিকে থাকে, আবার কোনোটি নাটকীয় পরিণতিতে ধ্বংস হয়। ফলে একটি গ্রহ কত দিন টিকে থাকবে, তার উত্তর একক কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা বলছেন, একটি গ্রহের আয়ু নির্ধারণে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তার মাতৃ নক্ষত্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, তরুণ নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার ঘূর্ণায়মান চাকতি থেকেই গ্রহের যাত্রা শুরু। সূক্ষ্ম কণাগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে বড় হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাকর্ষ বল সক্রিয় হলে এই বৃদ্ধি দ্রুততর হয়। এক পর্যায়ে অসংখ্য সংঘর্ষ ও সংযোজনের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহের রূপ নেয়। একজন জ্যোতিঃপদার্থবিদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই ধারাবাহিক সংঘর্ষই গ্রহ গঠনের প্রধান প্রক্রিয়া। বৃহস্পতির মতো গ্যাসীয় দানব গ্রহগুলো প্রথমে বিশাল পাথুরে কেন্দ্র হিসেবে তৈরি হয়, পরে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের ঘন আবরণ নিজেদের দিকে টেনে নেয়।
তবে সব গ্রহ একই পরিণতির দিকে এগোয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিকটবর্তী গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষে অথবা নিজ নক্ষত্রের অভ্যন্তরে পতিত হয়ে গ্রহের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। একজন গ্রহবিজ্ঞানীর মতে, একটি গ্রহ তখনই কার্যত মৃত বলে বিবেচিত হয়, যখন সেখানে আর প্রাণ ধারণের সম্ভাবনা থাকে না কিংবা পূর্বের সক্রিয় অবস্থা বজায় থাকে না। সমুদ্র শুকিয়ে যাওয়া, টেকটোনিক প্লেটের চলাচল থেমে যাওয়া বা বায়ুমণ্ডল হারিয়ে ফেলা এ ধরনের মৃত্যুর লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎও তার মাতৃ নক্ষত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে সূর্য তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তরিত করে বিপুল পরিমাণ আলো ও তাপ উৎপন্ন করছে, যা পৃথিবীতে জীবনের ভিত্তি। কিন্তু নক্ষত্রেরও জীবনচক্র আছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্য তার হাইড্রোজেনের ভাণ্ডার ফুরিয়ে ফেলবে এবং আকারে স্ফীত হয়ে লাল দানবে রূপ নেবে। তবে সেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা পৃথিবীর সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করবে। পৃষ্ঠের পানি বিলীন হয়ে গেলে পৃথিবীতে জীবনের অবসান ঘটবে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবী হয় সূর্যের প্রসারিত আবরণে বিলীন হবে, নয়তো নক্ষত্রের ভর হ্রাসের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে সরে গিয়ে মহাকাশে ছিটকে পড়বে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, সৃষ্টি থেকে সম্ভাব্য ধ্বংস পর্যন্ত পৃথিবীর মোট আয়ুষ্কাল প্রায় ৯৫০ কোটি বছর।
সব নক্ষত্র অবশ্য সূর্যের মতো নয়। অনেক নক্ষত্র আকারে ছোট ও তুলনামূলক শীতল, যাদের লাল বামন বলা হয়। এরা অত্যন্ত ধীরগতিতে জ্বালানি ব্যবহার করে, ফলে তাদের আয়ু অনেক দীর্ঘ। এই ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলো পৃথিবীর তুলনায় বহুগুণ বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। একটি মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রহের অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াও তার আয়ু নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। টেকটোনিক প্লেটের গতি ও ম্যান্টলের কনভেকশন কার্বন সিলিকেট চক্রের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, যা অনেকটা স্বয়ংক্রিয় তাপ নিয়ন্ত্রকের মতো কাজ করে। লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে থাকা পাথুরে গ্রহগুলোয় এই প্রক্রিয়া ৩০ থেকে ৯০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। তবে মহাবিশ্বের অসংখ্য পাথুরে গ্রহ তাদের নক্ষত্র নিভে যাওয়ার অনেক আগেই অভ্যন্তরীণভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে একটি গ্রহের আয়ু নির্ভর করে তার জন্মপরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ গঠন ও মাতৃ নক্ষত্রের বিবর্তনের ওপর। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নেই। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মহাজাগতিক সময়ের তুলনায় পৃথিবীর বর্তমান অবস্থান জীবন ধারণের এক অনন্য অধ্যায়, যারও নির্দিষ্ট সমাপ্তি আছে।







Add comment