আগামী ৩ মার্চ আকাশে দেখা যাবে বিরল এক মহাজাগতিক ঘটনা। ওই দিন পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ ধারণ করবে অদ্ভুত লালচে আভা, যা সাধারণভাবে ব্লাড মুন বা রক্তাভ চাঁদ নামে পরিচিত। ২০২৬ সালে এটিই হবে একমাত্র পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। ফলে এ দৃশ্য দেখার সুযোগ মিলবে কেবল একবারই। একই ধরনের আরেকটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণ প্রত্যক্ষ করতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের শেষভাগ পর্যন্ত।
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঘটে তখন, যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান নেয়। এ অবস্থায় সূর্যের সরাসরি আলো চাঁদের ওপর পড়তে পারে না। তবে পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসে না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সূর্যের আলোর একটি অংশ প্রতিসারিত হয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছে যায়। বায়ুমণ্ডল নীল রঙের স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বেশি ছড়িয়ে দেয় এবং লাল রঙের দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে চাঁদের দিকে প্রবাহিত করে। এর ফলেই গ্রহণ চলাকালীন চাঁদ তামাটে বা লালচে বর্ণ ধারণ করে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের সময় আকাশ লালচে দেখানোর পেছনে যে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করে, চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের রং পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আলোক বিচ্ছুরণ ও প্রতিসরণের ফল।
২০২৬ সালের এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে প্রত্যক্ষ করা যাবে। এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে গ্রহণটি ১২ থেকে ১৩ মিনিট স্থায়ী হবে। সর্বোচ্চ গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা যাবে সন্ধ্যা ৫টা ৩৩ মিনিটে। উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় ভোরবেলায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এ দৃশ্য দেখা যাবে। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার আকাশে সন্ধ্যার সময় লালচে চাঁদ দৃশ্যমান হবে।
সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে চোখ সুরক্ষার জন্য বিশেষ চশমা প্রয়োজন হলেও চন্দ্রগ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। এটি খালি চোখেই নিরাপদভাবে উপভোগ করা যায়। তবে সাধারণ একটি বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে চাঁদের পৃষ্ঠে আলোর পরিবর্তন ও ছায়ার বিস্তার আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা জানান, শহরের আলোক দূষণ থেকে দূরে, অপেক্ষাকৃত অন্ধকার এলাকায় অবস্থান করলে রক্তাভ চাঁদের লাল আভা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ সাধারণত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপ পেনামব্রাল পর্যায়, যখন চাঁদ পৃথিবীর হালকা ছায়ার মধ্যে প্রবেশ করে। এ সময় চাঁদের উজ্জ্বলতা সামান্য কমে যায়, যদিও পরিবর্তনটি অনেক ক্ষেত্রে খালি চোখে স্পষ্ট নাও হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় আংশিক গ্রহণ। তখন চাঁদের একটি অংশ পৃথিবীর মূল অন্ধকার ছায়ার মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে অন্ধকার বাড়তে থাকে।
সবশেষে আসে পূর্ণগ্রাস বা টোটালিটি পর্যায়। এই ধাপে চাঁদ সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর ঘন ছায়ায় আচ্ছাদিত হয়। সরাসরি সূর্যালোক না পেলেও বায়ুমণ্ডল দিয়ে প্রতিসারিত লাল আলোর কারণে চাঁদ লালচে রূপ ধারণ করে। এ সময় আকাশে ভেসে ওঠা রক্তিম চাঁদ সৃষ্টি করে এক অনন্য ও মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, যা জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুরাগীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের।
একক পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হিসেবে ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। নির্দিষ্ট সময় ও উপযুক্ত পরিবেশে অবস্থান করলে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ এই বিরল রক্তাভ চাঁদের সাক্ষী হতে পারবেন।







Add comment