দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ইতিহাসে এমন এক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফল শুধু একটি সরকারের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উত্তাল সময়কে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত চলচ্চিত্র No। সিনেমাটি দেখার আগেই এর পেছনের বাস্তব ইতিহাস জানা জরুরি, কারণ এটি ছিল ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের মধ্য দিয়ে একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়, সেটি হলো Missing। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই রাজনৈতিক চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন গ্রিক পরিচালক Costa-Gavras। গল্পের পটভূমি ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, যেদিন চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট Salvador Allendeকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাপ্রধান Augusto Pinochet ক্ষমতা দখল করেন। একই সময়ে এক মার্কিন সাংবাদিক নিখোঁজ হন, যার অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে সিনেমার কাহিনি। চলচ্চিত্রটি কান উৎসবে স্বর্ণপাম অর্জন করে এবং সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরিচালকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করলেও আদালত তা খারিজ করে দেয়।
১৯৬০-এর দশকে চিলি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করত। ১৯৭০ সালে বামপন্থী জোটের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সম্পদ পুনর্বণ্টনের নীতি প্রথমে কিছু অর্থনৈতিক গতি আনলেও দ্রুত মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তাঁর জোট জয়ী হলেও একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী পরিকল্পিত অভ্যুত্থান ঘটায়। প্রেসিডেন্ট আত্মসমর্পণ না করে প্রাসাদেই আত্মহত্যা করেন। এরপর সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার সমর্থককে গ্রেপ্তার ও হত্যা করা হয়। নিহতের সংখ্যা পাঁচ থেকে পনেরো হাজারের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়। বহু মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হন।
ক্ষমতায় এসে সামরিক শাসক ধীরে ধীরে সব কর্তৃত্ব নিজের হাতে নেন। বিরোধী দমন করতে গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করা হয়, যার অভিযানে বহু মানুষ নিখোঁজ হন। ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন করা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে বাজারমুখী নীতি প্রণয়ন করেন, যাঁদের ‘শিকাগো বয়েজ’ বলা হতো। কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি এলেও সাধারণ মানুষের জীবনমান অবনতি ঘটে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি পরে সংকটে পড়ে।
১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে গাড়িবোমা হামলায় চিলির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাঁর সহকারী নিহত হন। তদন্তে উঠে আসে, হামলাটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। চাপের মুখে ১৯৮০ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যাতে ১৯৮৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে শাসকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিধান রাখা হয়।
১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে ভোটারদের সামনে ছিল দুটি বিকল্প, ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। ‘হ্যাঁ’ মানে আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকা, আর ‘না’ মানে পরের বছর সাধারণ নির্বাচন। এই প্রেক্ষাপটেই নির্মিত No চলচ্চিত্রটি। গল্পে এক বিজ্ঞাপনকর্মী ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা তৈরির দায়িত্ব পান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। ভয় নয়, আশা ও আনন্দের বার্তা দিয়ে প্রচারণা চালানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়। টানা ২৭ রাত সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সিনেমাটিতে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকৃত আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি অস্কারে মনোনয়ন পায়।
গোপন নথিতে প্রকাশ, গণভোটে পরাজয়ের আশঙ্কায় শাসকপক্ষ তিন ধাপের জরুরি পরিকল্পনা করেছিল। ফল জাল করা কিংবা সহিংসতা উসকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারির চিন্তাও ছিল। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট ছিল, গণভোট বানচাল করলে সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভোটে নিবন্ধিতদের প্রায় ৯৭ শতাংশ অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ‘না’ ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ পায় ৪৩ শতাংশ। কিছু সময় ফল প্রকাশ বন্ধ থাকলেও সামরিক নেতৃত্বের ভেতর সমর্থন না পাওয়ায় দমন অভিযান শুরু হয়নি।
১৯৯০ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পালনের পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেন এবং দেশ ধীরে ধীরে পূর্ণ গণতন্ত্রে ফিরে যায়। সাবেক শাসক পরে সেনাবাহিনীর প্রধান ও আজীবন সিনেটর হিসেবে থাকেন। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে চিকিৎসার সময় আন্তর্জাতিক পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হন। পরে দেশে ফিরে একাধিক মানবাধিকার মামলার মুখোমুখি হন। জীবদ্দশায় কোনো মামলার চূড়ান্ত রায় হয়নি। ২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলেও সামরিক মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
চিলির ১৯৮৮ সালের গণভোট তাই কেবল একটি ভোট ছিল না, এটি ছিল কৌশল, সাহস, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য সমন্বয়, যা একটি দেশের ইতিহাস বদলে দেয়।







Add comment