যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত এই চুক্তির অবসান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০১০ সালে স্বাক্ষরিত নিউ স্টার্ট চুক্তিটি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের লক্ষ্যে করা হয়েছিল। ভয়াবহ পারমাণবিক সংঘাত প্রতিরোধে যেসব সীমিত সংখ্যক চুক্তি কার্যকর ছিল, এটি তার মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হতো। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ সর্বোচ্চ এক হাজার পাঁচ শত পঞ্চাশটি কৌশলগত পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে পারত। পাশাপাশি তথ্য আদানপ্রদান এবং সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে একে অপরের সামরিক সক্ষমতার ওপর নজরদারির সুযোগ ছিল।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব একে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এই অবসান বিশ্বকে এমন এক অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর কার্যকর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার রয়েছে। তিনি উভয় দেশকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন কোনো কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত বুধবার মধ্যরাতে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতা আপাতত থেমে গেল। একসময় এই ধরনের চুক্তিগুলো স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্টার্ট চুক্তি উভয় পক্ষের পারমাণবিক অস্ত্র সংখ্যা ছয় হাজারের নিচে নামিয়ে আনতে সহায়তা করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানীতে নিউ স্টার্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা আগের চুক্তির উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ার পর তিন বছর আগে রাশিয়া এই চুক্তি স্থগিত করলেও বাস্তবে উভয় দেশ এর অনেক শর্ত মেনে চলছিল বলে ধারণা করা হয়। এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়ক ছিল।
নিউ স্টার্টের অবসানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর আগে ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট বাতিল হয়েছে, যা ইউরোপে স্বল্পপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন সীমিত করেছিল। ওপেন স্কাইস ট্রিটির মাধ্যমে অস্ত্রহীন পর্যবেক্ষণকারী উড়োজাহাজ ব্যবহার করে একে অপরের সামরিক তৎপরতা নজরদারির সুযোগ ছিল। পাশাপাশি কনভেনশনাল আর্মড ফোর্সেস ইন ইউরোপ ট্রিটি ইউরোপে রাশিয়া ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ট্যাংক, সেনা ও কামানের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখত।
যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান এক বক্তব্যে সতর্ক করে বলেন, বিশ্বকে নিরাপদ রাখার যে কাঠামো ছিল তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর বাড়তি গুরুত্ব আর বড় বড় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির অবসান বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তার অন্যতম বিপজ্জনক দিক।
রাশিয়ার একজন প্রভাবশালী সাবেক নেতা সাম্প্রতিক সময়ে মন্তব্য করেছেন, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া সবার জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। একই সময়ে রুশ নেতৃত্বের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জানান, চুক্তির অবসান সত্ত্বেও দেশটি পরিমিত ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে চায়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা আর কোনো বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় সামরিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে তুলনামূলকভাবে কম উদ্বেগের সুর শোনা গেছে। তাঁদের মতে, প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরও ভালো কোনো চুক্তি করা সম্ভব। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, নতুন কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কারণ দেশটি দ্রুত তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ কূটনীতিকও একই মত প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ভবিষ্যতের কোনো চুক্তিতে ইউরোপের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই বর্তমানে নিজেদের পারমাণবিক শক্তি আধুনিকায়নে ব্যস্ত। ফলে একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা কার্যত শুরু হয়ে গেছে। দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক অস্ত্র এই প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব উন্নয়ন ভবিষ্যতে কোনো নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পথ আরও কঠিন করে দেবে।
সব মিলিয়ে নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান এমন এক সময় এসেছে, যখন বিশ্ব ইতোমধ্যে নানা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় জর্জরিত। এই পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক এক যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।







Add comment