নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন। আবাসন সংকট, গণপরিবহন ব্যবস্থা ও শিশু যত্নের মতো জটিল ইস্যু তার অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকলেও যাত্রা শুরু করেছেন এক ভিন্ন খাত থেকে, পাবলিক টয়লেট।
শহরটিতে প্রতি ৮ হাজার ৫০০ বাসিন্দার জন্য রয়েছে মাত্র একটি পাবলিক টয়লেট। অনেকগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ, দুর্গন্ধযুক্ত এবং বেশ কয়েকটির ফ্লাশ পর্যন্ত ঠিকমতো কাজ করে না। কিছু স্থানে এগুলো গৃহহীন মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বাস্তবতা নাগরিক সেবার ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
মেয়র এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যখন কোথাও শৌচাগার খুঁজে পাওয়া যায় না, তখনই বোঝা যায় শহরে এর কতটা অভাব রয়েছে এবং বাসিন্দাদের কতটা নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার ওপর অথবা সাত ডলার খরচ করে কফি কিনে ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতার ওপর। তার মতে, এ ধরনের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করে।
দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি এ খাতে উদ্যোগ নেওয়াকে প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক নেতার ভাষ্য, পাবলিক টয়লেটের করুণ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে জনসেবামূলক অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বৃহত্তর ব্যর্থতার প্রতিফলন। যদি নাগরিকদের স্টারবাকস বা ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয় একটি মৌলিক সেবার জন্য, তবে তারা জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মতো বড় সমস্যায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
তিনি সম্প্রতি একটি নতুন পাবলিক টয়লেট উদ্বোধন করেছেন এবং শহর তহবিল থেকে ৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। এ অর্থ দিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ২০ থেকে ৩০টি নতুন মডুলার টয়লেট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভাষায়, কার্যকর সরকারের চেহারা কেমন হতে পারে, তার সূচনা এখান থেকেই দেখাতে হবে। প্রতিটি সফল বাস্তবায়ন নাগরিকদের কাছে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকার প্রমাণ হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র আটটি পাবলিক টয়লেট, যা বিশ্বে ৩০তম অবস্থানে এবং বোতসোয়ানার সমান। অনেকের মতে, উন্নয়নশীল দেশের মতোই সীমিত এই প্রবেশাধিকার জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও জীবনমানের অবনতি ডেকে আনছে। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহর প্রশাসন এখন এ সংকট কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে।
শৌচাগারের অভাবে খাবার সরবরাহকর্মী ও পথবিক্রেতাদের অনেক সময় বোতলে প্রস্রাব করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। মূত্রথলি বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষদের জন্য জনসমক্ষে চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফিলাডেলফিয়া, সান ডিয়েগোসহ কয়েকটি শহরে হেপাটাইটিস এ সংক্রমণের বিস্তারও শৌচাগার সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সংকট কেবল স্বাস্থ্য নয়, অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। সান ফ্রান্সিসকোকে প্রতি বছর রাস্তায় মলমূত্র পরিষ্কারে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। শপিং জেলা, পার্ক ও জনসমাগমস্থলগুলোতেও দর্শনার্থীরা প্রয়োজনীয় সুবিধা না পেয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলে আর্থিক ক্ষতি হয়।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রোগ বিস্তার ও দুর্গন্ধের আশঙ্কায় স্থানীয় সরকারগুলো পাবলিক টয়লেট নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছিল। মদবিরোধী আন্দোলনের নেতারাও পুরুষদের বার থেকে দূরে রাখতে পাবলিক শৌচাগারের পক্ষে প্রচারণা চালান। পরে নিষেধাজ্ঞা জারির আগে বিভিন্ন শহর দ্রুত টয়লেট স্থাপনে প্রতিযোগিতায় নামে। তবে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা কখনোই পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সত্তর ও আশির দশকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে নিউইয়র্কসহ বহু শহরে শৌচাগার বন্ধ করে জনসেবা কমিয়ে দেওয়া হয়।
বর্ণ, লিঙ্গ ও অন্যান্য সামাজিক ইস্যুকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক টয়লেট বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ ছিল অন্যতম দাবি। একই সময়ে সমকামী পুরুষদের গ্রেপ্তারে পুলিশ টয়লেটকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। সাম্প্রতিক দশকে ট্রান্সজেন্ডারদের প্রবেশাধিকার নিয়েও তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
নতুন টয়লেট নির্মাণ ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, কারণ এগুলোকে ভূগর্ভস্থ পয়োনিষ্কাশন, পানি ও বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি প্রকল্প ব্যয়বৃদ্ধি ও সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২২ সালে সান ফ্রান্সিসকো একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ১.৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০০৬ সালে নিউইয়র্কে ২০টি স্বয়ংক্রিয় টয়লেট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি স্থাপন করা সম্ভব হয়।
বর্তমানে শহর কর্তৃপক্ষ মডুলার টয়লেট স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরপত্র আহ্বান করছে। এসব ইউনিট তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল, কারণ সেগুলোকে স্থায়ীভাবে ইউটিলিটি লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয় না। একটি প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১ লাখ ডলারে স্থাপন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সেবা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রবেশ এবং সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
মেয়রের মতে, টয়লেট নির্মাণ হয়তো আড়ম্বরপূর্ণ কাজ নয় এবং সব সময় ফিতা কাটার অনুষ্ঠানও থাকে না। তবে এটি কার্যকর সরকারের পরিচয় বহন করে। তার ভাষায়, শহর প্রশাসন যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সামান্য হলেও সহজ করতে পারে, সেটিই সরকারের প্রকৃত দায়িত্ব পালনের প্রমাণ।







Add comment