শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে ব্রিটেনের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা ছিল ‘পোর্টল্যান্ড স্পাই রিং’। ১৯৬১ সালের ১৩ মার্চ এই মামলার বিচার শুরু হলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। গুপ্তচরবৃত্তি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গোপন প্রযুক্তি এবং অবাক করা ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অপারেশন দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দা ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৬৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এক বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে এক দম্পতি গুপ্তচরকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাদের বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে আটক এক ব্রিটিশ প্রভাষককে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তির পর পোল্যান্ডগামী বিমানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এক ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদক জানান, দীর্ঘ নয় বছর কারাভোগের পর তারা সেই রাষ্ট্রের মাটিতে ফিরে যাচ্ছেন, যার পক্ষে তারা গোপনে কাজ করেছিলেন।
এই দম্পতি ছিলেন পাঁচ সদস্যের কুখ্যাত পোর্টল্যান্ড গুপ্তচর চক্রের অংশ। ১৯৬১ সালে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মূল কাজ ছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর গোপন সামরিক গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করে মস্কোতে পাঠানো। অত্যন্ত কৌশলী যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের দায়ে তারা আলোচনায় আসেন।
গুপ্তচরদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত অ্যাডমিরালটি আন্ডারওয়াটার ওয়েপনস এস্টাবলিশমেন্ট নামের একটি গবেষণা কেন্দ্র। এখানে রয়্যাল নেভির জন্য অত্যন্ত গোপন সামরিক প্রকল্প নিয়ে কাজ চলত। বিশেষ করে সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা হতো সেখানে। গবেষণার প্রতিটি প্রকল্পের বিস্তারিত নথি, ছবি, নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করা হতো, যা বিদেশি গোয়েন্দাদের কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
এই তথ্য সংগ্রহে সরাসরি যুক্ত ছিলেন গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরে কর্মরত দুই ব্যক্তি। তাদের একজন ছিলেন সাবেক নৌবাহিনীর কর্মকর্তা, যিনি পোল্যান্ডে ব্রিটিশ দূতাবাসে কাজ করার সময় কমিউনিস্ট গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগে আসেন। ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে তিনি পোর্টল্যান্ড গবেষণা কেন্দ্রে কেরানি হিসেবে চাকরি নেন এবং সেখান থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন।
কর্মস্থলে তার সহকর্মী এক নারী কর্মীর সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারী উচ্চস্তরের নথিতে প্রবেশাধিকার রাখতেন। তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে লন্ডনে যাতায়াত করতেন এবং সেখানে গোপনে একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে তথ্য হস্তান্তর করতেন।
পরে ২০১৯ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ প্রকাশিত নথিতে জানা যায়, এই চক্রটি আরও আগেই ধরা পড়তে পারত। কারণ ওই নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার স্ত্রী তার আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, স্বামী লন্ডন থেকে ফিরে একবার মুঠো ভরা পাউন্ড নোট বাতাসে ছুড়ে দেন। আরেকবার তার ডেস্কে রাখা একটি পার্সেল খুলে তিনি “টপ সিক্রেট” লেখা কাগজপত্র দেখতে পান। এমনকি সিঁড়ির নিচে লুকানো একটি ক্ষুদ্র ক্যামেরা নিয়ে প্রশ্ন করলে তার স্বামী রেগে যান। কিন্তু গোয়েন্দারা সে সময় এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি।
এই ছোট ক্যামেরাটি ছিল গুপ্তচরদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। মাইক্রোডট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় বড় নথির ছবি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো ফিল্মে সংরক্ষণ করা হতো। একটি ছোট বিন্দুর ভেতরেই পুরো পৃষ্ঠার তথ্য লুকিয়ে রাখা যেত। পরে পোস্টকার্ড বা বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে এই তথ্য সহজেই মস্কোতে পাঠানো সম্ভব ছিল।
চক্রটির আরেক অংশ ছিল যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের দল। লন্ডনের এক শান্ত উপশহরে বসবাসকারী এক দম্পতি নিজেদের প্রাচীন বইয়ের ব্যবসায়ী ও গৃহিণী হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় তাদের বিদেশে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য আদর্শ আড়াল তৈরি করেছিল। বাস্তবে তারা ছিলেন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞ এজেন্ট। তাদের সাধারণ দেখানো বাড়ির ভেতরেই ছিল একটি উন্নত যোগাযোগ কেন্দ্র, যেখানে লুকানো রেডিও ট্রান্সমিটার ও মাইক্রোডট তৈরির সরঞ্জাম ছিল।
এই চক্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন আরেক ব্যক্তি, যিনি লন্ডনে নিজেকে কানাডীয় ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি জুকবক্স ও ভেন্ডিং মেশিন সরবরাহের ব্যবসা চালাতেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, যার কাজ ছিল গবেষণা কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত তথ্য সংগ্রহ করে তা ওই দম্পতির কাছে পৌঁছে দেওয়া।
কয়েক বছর ধরে এই কার্যক্রম গোপনে চললেও শেষ পর্যন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সূত্রে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তদন্ত শুরু করে। পোল্যান্ডের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, যিনি পরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করেন, জানান যে ব্রিটিশ নৌ গবেষণার সঙ্গে জড়িত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সোভিয়েতদের তথ্য দিচ্ছেন।
এরপর এমআই৫ কর্মকর্তারা পোর্টল্যান্ড গবেষণা কেন্দ্রে তদন্ত শুরু করেন। সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন ওই সাবেক নৌ কর্মকর্তা ও তার সহকর্মী। তাদের লন্ডনে গোপন বৈঠক পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গোয়েন্দারা এক পর্যায়ে পুরো চক্রটির সন্ধান পেয়ে যান।
১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে লন্ডনে এক বৈঠকের পর ওই দুই কর্মী এবং মধ্যস্থতাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বহন করা ব্যাগে রয়্যাল নেভির গুরুত্বপূর্ণ নথি ও একটি ফিল্মের ক্যান পাওয়া যায়, যাতে ব্রিটেনের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিন সংক্রান্ত তথ্য ছিল। একই দিনে উপশহরের বাড়ি থেকে ওই দম্পতিকেও আটক করা হয়।
পরবর্তী তল্লাশিতে তাদের বাড়ির ভেতরে লুকানো ঘর, গোপন রেডিও অ্যান্টেনা, শক্তিশালী ট্রান্সমিটার এবং বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে গণমাধ্যমে বাড়িটিকে “গোপন রহস্যের বাংলো” বলে উল্লেখ করা হয়।
দুই সপ্তাহব্যাপী বিচার শেষে মধ্যস্থতাকারীকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও চার বছরের কম সময় কারাভোগের পর বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে দম্পতি গুপ্তচরকে ২০ বছরের সাজা দেওয়া হয় এবং পরে এক বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়।
গবেষণা কেন্দ্রের দুই কর্মীকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তারা প্রায় নয় বছর কারাভোগ করেন। মুক্তির পর তাদের একজন আবার পোর্টল্যান্ডে ফিরে যান এবং জনসমক্ষে “বিশ্বাসঘাতক” বলে কটূক্তির মুখেও পড়েন। পরে ওই দুইজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
এই ঘটনা আজও শীতল যুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত গুপ্তচরবৃত্তির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।





Add comment