নোবেলিয়াম আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ দ্বন্দ্ব

পর্যায় সারণীর ১০২ নম্বর মৌল নোবেলিয়াম। ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের নাম অনুসারে এই মৌলটির নামকরণ করা হয়েছে। তবে নামের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘ বিতর্ক, নাটকীয়তা এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস। বিশেষ করে এই মৌলের আবিষ্কারকে ঘিরে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ এবং প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল, যা অনেকেই বিজ্ঞানজগতের এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নোবেলিয়াম প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ পৃথিবীর কোথাও এটি প্রাকৃতিক অবস্থায় বিদ্যমান নয়। গবেষণাগারে বিশেষ পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয় এই মৌল। তেজস্ক্রিয় বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে না। ফলে এই মৌল নিয়ে গবেষণাও বেশ সীমিত এবং জটিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, এখন পর্যন্ত নোবেলিয়ামের খুব অল্পসংখ্যক পরমাণু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এই মৌলের সবচেয়ে স্থিতিশীল আইসোটোপ হলো নোবেলিয়াম-২৫৯। কিন্তু সেটির স্থায়িত্বও খুবই স্বল্প। এই আইসোটোপের আয়ু মাত্র প্রায় ৫৮ মিনিট। অর্থাৎ এক ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। এ কারণেই নোবেলিয়াম নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

নোবেলিয়ামের কোনো জৈবিক ভূমিকা নেই বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। জীবজগতের কোনো প্রক্রিয়ায় এই মৌলের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং এর তেজস্ক্রিয়তার কারণে এটি অত্যন্ত বিষাক্ত। ফলে জীবন্ত প্রাণীর জন্য এটি বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়।

এই মৌলটি আবিষ্কার নিয়ে বিতর্কের সূচনা ঘটে ১৯৫০–এর দশকে। সে সময় বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা পরমাণু গবেষণায় দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করছিলেন। ১৯৫৬ সালে মস্কোর একটি পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল দাবি করেছিল যে তারা প্রথম নোবেলিয়াম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সে সময় তারা এই তথ্য প্রকাশ করেনি।

এরপর ১৯৫৭ সালে স্টকহোমের একটি বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেয় যে তারা নতুন একটি মৌল তৈরি করেছে। সেই মৌলের নাম রাখা হয় নোবেলিয়াম, ডিনামাইটের আবিষ্কারকের সম্মানে। এই ঘোষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

কিন্তু বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে ১৯৫৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের একজন বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে আরেকটি দল দাবি করে, স্টকহোমের প্রতিষ্ঠানের দাবি সঠিক নয়। তাদের মতে, আসলে তারাই প্রথম নোবেলিয়াম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই দাবি পাল্টা দাবির ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলের আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতবিরোধ চলতে থাকে।

বিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, নোবেলিয়াম রাসায়নিক আচরণের দিক থেকে তার প্রতিবেশী মৌলগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। সাধারণত এই শ্রেণির মৌলগুলো এক ধরনের আচরণ দেখালেও নোবেলিয়াম অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নোবেলিয়াম রাসায়নিকভাবে ক্যালসিয়াম বা বেরিয়ামের মতো ক্ষারীয় মৃত্তিকা ধাতুর সঙ্গে কিছুটা মিল রেখে আচরণ করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি বড় অণুর অংশ হিসেবে নোবেলিয়ামকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এই সাফল্যকে রসায়ন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এত অস্থিতিশীল একটি মৌলকে অণুর অংশ হিসেবে শনাক্ত করা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

সব মিলিয়ে নোবেলিয়াম শুধু একটি রাসায়নিক মৌল নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতা, গবেষণার জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বিতর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এই মৌলকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের সেই অমীমাংসিত প্রতিযোগিতা আজও বিজ্ঞান ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে আছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed