বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল ও সীমানা অতিক্রমকারী এক গবেষণা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন ইনস্টিটিউট, গবেষণাগার এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের মাধ্যমে নতুন ধারণা ছড়িয়ে পড়ত দেশ থেকে দেশে। সেই সময়ের অগ্রগামী গবেষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্ম নেওয়া এক নারী পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি প্রতিকূল সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও তেজস্ক্রিয়তা ও পারমাণবিক গবেষণায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ যখন ছিল সীমিত, তখন তিনি গবেষণাক্ষেত্রে নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮৭৮ সালে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী ১৯০৬ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী দ্বিতীয় নারী হন। পরবর্তীতে তিনি বার্লিনে পাড়ি জমান এবং সেখানকার খ্যাতিমান এক পদার্থবিজ্ঞানীর বক্তৃতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে এক জার্মান রসায়নবিদের পেশাগত সম্পর্কের সূচনা হয়, যা বহু বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১৯১৭ সালে এই গবেষকদ্বয় প্রোটেক্টিনিয়াম মৌল শনাক্ত করেন। এর মাধ্যমে তিনি জার্মান বৈজ্ঞানিক সমাজে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম নারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল পরমাণুর গঠন বিশ্লেষণ এবং ইউরেনিয়াম থেকে বিপুল শক্তি নির্গমনের সম্ভাবনা অনুধাবন করা। সে সময় এসব ধারণা মূলত গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, এগুলো পরবর্তীতে বিশ্বরাজনীতি ও সামরিক নীতিনির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৩৩ সালের পর জার্মানির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যায়। ১৯৩৮ সালে জীবনরক্ষার তাগিদে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। নেদারল্যান্ডস হয়ে তিনি সুইডেনে আশ্রয় নেন। কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিনের পদ, সহকর্মী ও সম্পদ পেছনে ফেলে নির্বাসিত জীবনে পা রাখতে হয় তাঁকে। স্টকহোমে অবস্থান করলেও তাঁর সঙ্গে জার্মান রসায়নবিদ সহকর্মীর যোগাযোগ বজায় ছিল।
১৯৩৮ সালের শেষদিকে সেই রসায়নবিদ ও তাঁর সহকর্মী নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়াম আঘাত করার পর এক অপ্রত্যাশিত ফলাফল পান, যার ব্যাখ্যা তারা দিতে পারছিলেন না। এ সময় বিজ্ঞানীর ভাইপো তাঁর কাছে বেড়াতে এলে দুজনে মিলে পরীক্ষালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করেন। বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস দুটি ছোট অংশে বিভক্ত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন। ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
কিন্তু ১৯৪৪ সালে ফিশন সংক্রান্ত কাজের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে সেই জার্মান রসায়নবিদ এককভাবে সম্মাননা পান। তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদানকারী এই নারী বিজ্ঞানীর নাম সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই বঞ্চনা আজও বিজ্ঞান ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজনিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের বিভাজন এবং লিঙ্গবৈষম্য এ সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব ফেলেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন পারমাণবিক প্রকল্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে শান্তিবাদী অবস্থান থেকে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্পষ্ট করে জানান যে বোমা তৈরির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। যুদ্ধোত্তর সময়ে তিনি সুইডেন ও ব্রিটেনে গবেষণা অব্যাহত রাখেন। নোবেল পুরস্কার না পেলেও তিনি ম্যাক্স প্লাঙ্ক মেডেল ও এনরিকো ফের্মি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। পরবর্তীতে পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌলের নাম তাঁর সম্মানে রাখা হয় মাইটনারিয়াম।
১৯৬৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সমাধিস্তম্ভে খোদাই করা হয় একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য, যেখানে তাঁকে এমন একজন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে স্মরণ করা হয়, যিনি কখনো মানবতা বিসর্জন দেননি। বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মানবিক অবস্থান ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে অম্লান হয়ে রয়েছে।







Add comment