নেপালের নবগঠিত প্রতিনিধি সভা দেশটির রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ প্রার্থী আইনপ্রণেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় আইনসভায় প্রবেশ করেছেন। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত রোববার রাত পর্যন্ত ঘোষিত ১৫৯টি নির্বাচনী এলাকার ফলাফলের ভিত্তিতে দেখা যায়, মোট ৫৯ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন যাঁদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। এই সংখ্যা মোট নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রায় ৩৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বয়সের ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে নেপালের সংসদীয় কাঠামোতে তুলনামূলকভাবে বেশি বয়সী নেতাদের প্রাধান্য ছিল। ২০২২ সালে নির্বাচিত সংসদে ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী সদস্যদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই সংসদে ৪০ বছরের কম বয়সী সদস্যের হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল ২০১৭ সালের নির্বাচনের পর গঠিত প্রতিনিধি সভাতেও। ওই সময় সংসদে ৪০ বছরের নিচে সদস্যের হার ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। সেই তুলনায় এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তরুণ আইনপ্রণেতাদের এই উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। দলটির অনেক প্রার্থীই তুলনামূলকভাবে কম বয়সী এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন। রোববার রাত পর্যন্ত নির্বাচিত ৫৯ জন তরুণ আইনপ্রণেতার মধ্যে ৫১ জনই এই দলটির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া ৪০ বছরের নিচে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে নেপালি কংগ্রেস থেকে চারজন এবং সিপিএন-ইউএমএল থেকে দুজন রয়েছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির একজন প্রার্থীও এই বয়সসীমার প্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
নতুন সংসদে প্রবেশ করা তরুণ সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যেই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন। ঝাপা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত ৩৫ বছর বয়সী একজন প্রতিনিধি, চিতওয়ান-৩ আসন থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন সদস্য, রূপান্দেহি-২ আসন থেকে ২৮ বছর বয়সী আরেকজন এবং মোরং-৬ আসন থেকে ৩১ বছর বয়সী একজন নারী প্রতিনিধি নতুন আইনসভায় তুলনামূলক তরুণ মুখ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়াও ঝাপা-১ আসন থেকে ২৯ বছর বয়সী এক সদস্য, কাঠমান্ডু-১ আসন থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন নারী প্রতিনিধি এবং কাঠমান্ডু-৫ আসন থেকে ২৯ বছর বয়সী একজন সদস্য নতুন সংসদের কনিষ্ঠ সদস্যদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি দেশটির রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে তরুণ প্রতিনিধিদের সংখ্যা বাড়ায় নীতিনির্ধারণের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সংক্রান্ত নীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয় সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এক বিশ্লেষকের মতে, নেপালের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অনেকাংশে পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও চর্চার ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন সহজ নাও হতে পারে।
তাঁর মতে, তরুণ রাজনীতিকদের নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী চিন্তার সঙ্গে প্রশাসনিক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটানোই হবে আগামী সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও সংসদে তরুণদের এই উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেপালের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





Add comment