নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, বিভাজন, কৌশল আর কখনো কখনো হতাশার দীর্ঘ ছায়া। বাস্তব রাজনীতির ধূসর জগৎ যখন নানা হিসাব-নিকাশে জটিল হয়ে ওঠে, তখন সিনেমা সেই একই প্রেক্ষাপটকে নিয়ে হাজির হয় ভিন্ন এক ভাষায়। সেখানে নির্বাচন হয়ে ওঠে হাস্যরস, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আর বর্ণিল চরিত্রের সমাহার। ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব, আন্ডারডগের উত্থান, মিডিয়ার প্রভাব, কেলেঙ্কারি এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয় মোড়-সব মিলিয়ে নির্বাচনী কমেডি ঘরানার ছবিগুলো দর্শকদের সামনে রাজনীতির আরেকটি মুখ উন্মোচন করে। ভোটের আবহে মনকে হালকা করতে কিংবা রাজনৈতিক নাটকীয়তাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে চাইলে এই পাঁচটি সিনেমা হতে পারে সময়োপযোগী পছন্দ।
ব্ল্যাক শিপ
অভিনয়ে রয়েছেন ক্রিস ফার্লি ও ডেভিড স্পেড। পরিচালনায় পেনেলোপ স্পিরিস। এই ছবিতে ক্রিস ফার্লির স্বতন্ত্র কমেডি ভঙ্গির পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায়। গল্পে মাইক ডনেলি তাঁর ভাইয়ের গভর্নর নির্বাচনের প্রচারণায় যুক্ত হয়ে একের পর এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেন। পারিবারিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতে তৈরি হয় ধারাবাহিক হাস্যকর মুহূর্ত।
ছবিটি সৎ প্রার্থী বনাম যে কোনো মূল্যে জিততে চাওয়া প্রতিপক্ষের দ্বৈরথকে সরল রেখায় তুলে ধরে। কিছু কৌতুক প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের কাছে সরল মনে হতে পারে, তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপন ছবিটিকে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
ওয়াগ দ্য ডগ
অভিনয়ে রবার্ট ডি নিরো ও ডাস্টিন হফম্যান। পরিচালনা করেছেন ব্যারি লেভিনসন। নির্বাচন ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত এই স্যাটায়ার রাজনীতির অন্তরালের কৌশলকে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরে। প্রেসিডেন্টের যৌন কেলেঙ্কারি আড়াল করতে হোয়াইট হাউস একটি ভুয়া যুদ্ধের নাটক সাজায়, লক্ষ্য জনমত ঘুরিয়ে দেওয়া।
ছবিটি দেখায় কীভাবে রাজনৈতিক সংকটকে অন্যদিকে সরাতে মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয় এবং কীভাবে নির্মিত বাস্তবতাই মানুষের কাছে সত্য হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য যে, সিনেমাটি মুক্তির অল্প সময় পরই বাস্তবে একটি আলোচিত কেলেঙ্কারি সামনে আসে, যা এর ব্যঙ্গকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। দর্শককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় এই ছবি-ভোটার হিসেবে আমরা কতটা প্রভাবগ্রস্ত।
ইলেকশন
অভিনয়ে রিজ উইদারস্পুন ও ম্যাথিউ ব্রডেরিক। পরিচালনায় আলেকজান্ডার পেইন। একটি হাইস্কুলের ছাত্র পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এর ভেতরের রাজনীতি নিছক কিশোরদের নয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক ছাত্রী জয়ের জন্য মরিয়া, আর এক শিক্ষক ব্যক্তিগত অসন্তোষ থেকে তাকে ঠেকাতে সচেষ্ট হন।
নৈতিকতা ও জয়ের দ্বন্দ্ব এই ছবির মূল সুর। মুখে নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। ছোট পরিসরের এই নির্বাচনে বড় রাজনীতির প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বয়সের সীমা মানে না।
নেপোলিয়ন ডাইনামাইট
অভিনয়ে জন হেডার, এফ্রেন রামিরেজ ও হেইলি ডাফ। পরিচালনায় জ্যারেড হেস। কাল্ট মর্যাদা পাওয়া এই ছবিতে স্কুল নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। শান্ত ও অনাড়ম্বর এক শিক্ষার্থীর প্রার্থিতা জনপ্রিয় কিন্তু ভেতরে ফাঁপা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে দাঁড়ায়।
এখানে নির্বাচন মানে কেবল নীতি নয়, বরং অবহেলিতের উত্থান। দুই মাঝারি বিকল্পের মধ্যে তুলনামূলক ভালোকে বেছে নেওয়ার যে বাস্তব অভিজ্ঞতা, সেটি রসিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ একটি নাচের দৃশ্য ছবিটিকে স্মরণীয় করে রেখেছে এবং নির্বাচনী সিনেমার আলোচনায় বারবার ফিরে আসে।
দ্য ক্যামপেইন
অভিনয়ে উইল ফারেল ও জ্যাক গ্যালিফিয়ানাকিস। পরিচালনায় জে রোচ। আধুনিক মার্কিন নির্বাচনের চিত্রকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছে এই সিনেমা। কংগ্রেসের একটি আসন ঘিরে ক্ষমতাসীন প্রার্থীর সঙ্গে তুলনামূলক অপরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই দেখানো হয়েছে।
বড় অঙ্কের অর্থ, ইমেজ নির্মাণ, আক্রমণাত্মক প্রচারণা-সব মিলিয়ে রাজনীতির এক প্রহসনমূলক রূপ ফুটে ওঠে। ছবিটি দেখায়, নীতির চেয়ে বাহ্যিক উপস্থাপন ও প্রচারণা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। কিছু হাস্যরস অতিরঞ্জিত হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল ছবিটিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
এই পাঁচটি সিনেমা একত্রে মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি কেবল বক্তৃতা ও নীতির লড়াই নয়; এটি গল্প নির্মাণ, আবেগ, প্রভাব এবং কখনো নিখাদ প্রহসনের মিশ্রণ। নির্বাচনের উত্তাপে যখন পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে, তখন এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে।







Add comment