বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে চোখে পড়ে উজ্জ্বল আলোয় ঝলমলে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। নিয়ন বাতির সেই দৃষ্টিনন্দন আভা আজ নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই আলো কেবল আধুনিক প্রযুক্তির ফল নয়, বরং কয়েক শতাব্দীজুড়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতার ফলাফল। ১৬৭৫ সাল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীতে বাণিজ্যিক সাফল্য পাওয়া পর্যন্ত নিয়ন সাইন প্রযুক্তির পথচলা এক অনন্য ইতিহাস বহন করে।
নিয়ন আলোর প্রাথমিক ধারণার সূত্রপাত ঘটে বিদ্যুৎ যুগেরও আগে। ১৬৭৫ সালে ফ্রান্সের জ্যোতির্বিজ্ঞানী Jean Picard একটি পারদভর্তি ব্যারোমিটারের নলের ভেতরে অদ্ভুত এক আলোকচ্ছটা লক্ষ্য করেন। নলটি নাড়ালে ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট আলো তৈরি হতো, যা পরবর্তীকালে ব্যারোমেট্রিক লাইট নামে পরিচিতি পায়। তখন এর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত না হলেও এই ঘটনাই ভবিষ্যৎ গবেষণার পথ খুলে দেয়। পরে বিদ্যুতের নীতিমালা আবিষ্কৃত হলে বিজ্ঞানীরা গ্যাস ও বিদ্যুতের পারস্পরিক ক্রিয়ায় আলো উৎপাদনের ধারণা নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন।
১৮৫৫ সালে জার্মান কাঁচশিল্পী ও পদার্থবিদ Heinrich Geissler–এর নামানুসারে গেইসলার টিউব উদ্ভাবিত হয়। বৈদ্যুতিক জেনারেটর আবিষ্কারের পর উদ্ভাবকেরা এই টিউবের ভেতরে বিভিন্ন গ্যাস নিম্নচাপে রেখে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করার পরীক্ষা চালান। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। টিউবের ভেতরে থাকা গ্যাস উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠত। ১৯০০ সালের মধ্যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রিক ডিসচার্জ ল্যাম্প বা বাষ্পীয় বাতি তৈরি হয়। সহজভাবে বললে, এটি এমন এক স্বচ্ছ পাত্র যেখানে উচ্চ ভোল্টেজ প্রয়োগ করে গ্যাসকে উত্তেজিত করলে আলো সৃষ্টি হয়।
নিয়ন শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ নিওস থেকে, যার অর্থ নতুন। ১৮৯৮ সালে লন্ডনে William Ramsay এবং Morris W. Travers নিয়ন গ্যাস আবিষ্কার করেন। বায়ুমণ্ডলে এ গ্যাসের উপস্থিতি অত্যন্ত সামান্য, প্রায় ৬৫ হাজার ভাগের এক ভাগ। বায়ুকে তরল করে আংশিক পাতন প্রক্রিয়ায় এটি আলাদা করা হয়।
১৯০২ সালের দিকে ফরাসি প্রকৌশলী ও রসায়নবিদ Georges Claude প্রথমবার সিল করা টিউবের ভেতরে নিয়ন গ্যাসে বৈদ্যুতিক নিঃসরণ ঘটিয়ে কার্যকর বাতি তৈরি করেন। ১৯১০ সালের ১১ ডিসেম্বর প্যারিসে তিনি জনসমক্ষে এই বাতি প্রদর্শন করেন, যা ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে তিনি এর মেধাস্বত্ব লাভ করেন। ১৯২৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন বাতির বাজারজাত শুরু করে। দিনের আলোতেও দৃশ্যমান উজ্জ্বল লোগো দেখে পথচারীরা থমকে দাঁড়াত। অনেকে একে তরল আগুন বলেও অভিহিত করত।
নিয়ন বাতি তৈরির প্রক্রিয়াও কম আকর্ষণীয় নয়। সাধারণত ৪, ৫ বা ৮ ফুট দৈর্ঘ্যের ফাঁপা কাঁচের নল ব্যবহার করা হয়। গ্যাস ও বাতাসের শিখায় উত্তপ্ত করে এসব নলকে কাঙ্ক্ষিত আকারে বাঁকানো হয়। কাঁচের উপাদানভেদে এর গলনাঙ্ক ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। আকার দেওয়ার পর নলের ভেতরের বাতাস বের করে ফেলা হয় এবং উচ্চ ভোল্টেজ প্রয়োগ করে প্রায় ৫৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন বা আর্গন গ্যাস ভরা হয়। আর্গন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য পারদও যুক্ত করা হয়।
প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন গ্যাস লাল আভা সৃষ্টি করে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি রং তৈরি সম্ভব হয়েছে। লাল ছাড়া অন্য রং পেতে মূলত আর্গন, পারদ এবং ফসফারের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। পারদ থেকে নীল, কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে সাদা এবং হিলিয়াম থেকে সোনালি রং পাওয়া যায়। টিউবের ভেতরের ফসফার আস্তরণে অতিবেগুনি রশ্মির আঘাতে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের বিকিরণ তৈরি হয়। এভাবেই নিয়ন বাতি কেবল আলোর উৎস নয়, বরং রঙিন শিল্পকৌশলের প্রতীক হয়ে উঠেছে।







Add comment