আপনি যদি চিলির বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘নো’ এখনো না দেখে থাকেন, তবে সেটি দেখার মতোই একটি কাজ বাকি রয়েছে। ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক গণভোটকে ঘিরে নির্মিত এই সিনেমা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রচারণার গল্প নয়, বরং একটি দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনি। ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুই বিকল্পের একটিতে ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়েছিল চিলি সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় থাকবে, নাকি গণতন্ত্রের পথে ফিরবে।
এই প্রেক্ষাপট বোঝার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গ্রিক নির্মাতার চলচ্চিত্র ‘মিসিং’ ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী চিলির বাস্তবতাকে তুলে ধরে। সে সময় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করে সেনাপ্রধান ক্ষমতা দখল করেন। একই দিনে এক মার্কিন সাংবাদিক নিখোঁজ হন, যাঁর খোঁজে তাঁর পরিবার চিলিতে আসেন। চলচ্চিত্রটি প্রশ্ন তোলে, ওই অভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা ছিল কি না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত এ সিনেমা কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম অর্জন করে এবং সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত নির্মাতার বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন।
১৯৬০-এর দশকে চিলি নিজেদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করত। ১৯৭০ সালে বামপন্থী জোটের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি সম্পদের পুনর্বণ্টনসহ একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেন। শুরুতে অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এলেও দ্রুত মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেই তিনি আত্মহত্যা করেন। সেনাপ্রধান ক্ষমতা গ্রহণের পর হাজার হাজার সমর্থক গ্রেপ্তার ও নিহত হন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এটি অন্যতম রক্তাক্ত সামরিক দখল হিসেবে বিবেচিত, যেখানে পাঁচ থেকে পনেরো হাজার মানুষ প্রাণ হারান।
ক্ষমতা নেওয়ার পর সামরিক শাসক প্রথমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করলেও পরে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিরোধীদের দমনে গঠন করা হয় গোয়েন্দা সংস্থা ডিনা। ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে সংস্থাটির অভিযানে বহু মানুষ নিখোঁজ হন। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা একদল অর্থনীতিবিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাজারমুখী নীতিতে কিছু উন্নতি এলেও অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি আবার অবনতির দিকে যায়।
১৯৭৬ সালে ওয়াশিংটনে এক গাড়িবোমা বিস্ফোরণে চিলির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাঁর সহকারী নিহত হন। তদন্তে উঠে আসে, এই হামলা চিলির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত ছিল এবং উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে। অবশেষে ১৯৮০ সালে নতুন সংবিধানে ঘোষণা করা হয়, ১৯৮৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে শাসক আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকবেন কি না।
৫ অক্টোবর ১৯৮৮ অনুষ্ঠিত হয় সেই গণভোট। ‘হ্যাঁ’ মানে ক্ষমতায় বহাল থাকা, ‘না’ মানে সাধারণ নির্বাচন। প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোটার অংশ নেন। শুরুতে বিভ্রান্তিকর ফল ঘোষণা করা হলেও পূর্ণ গণনায় দেখা যায়, ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়ে ‘না’ পক্ষে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ পায় ৪৩ শতাংশ। সামরিক মহলের ভেতরেও বিভক্তি দেখা দিলে জরুরি অবস্থা জারি করে ফল বদলে দেওয়ার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এভাবেই গণতন্ত্রে ফেরার পথ খুলে যায়।
এই প্রেক্ষাপটেই নির্মিত হয় ২০১২ সালের চলচ্চিত্র ‘নো’। ছবির কেন্দ্রে এক তরুণ বিজ্ঞাপনকর্মী, যিনি ‘না’ প্রচারণার সৃজনশীল দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সীমিত সময়ের সুযোগ পেয়ে তিনি ভয়ের বদলে আশার বার্তা তুলে ধরেন। ২৭ রাত প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলো প্রাণবন্ত ও ভবিষ্যৎমুখী ছিল। আর্কাইভ ফুটেজের ব্যবহারে চলচ্চিত্রটি বাস্তবতার কাছাকাছি অবস্থান করে এবং অস্কার মনোনয়ন লাভ করে।
গণভোটে পরাজয়ের পর সামরিক শাসক ১৯৯০ সালের মার্চ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন। পরে সাবেক শাসক সেনাবাহিনীর প্রধান ও আজীবন সিনেটর হিসেবে থাকেন। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে গ্রেপ্তার, দেশে ফিরে একাধিক মানবাধিকার মামলা, গৃহবন্দিত্ব ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর শেষ জীবন কাটে। ২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর হৃদ্রোগে তাঁর মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলেও সামরিক মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
১৯৮৮ সালের সেই ‘না’ ভোট কেবল একটি নির্বাচন ছিল না; এটি ছিল কৌশল, সাহস, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার ঘটনা।







Add comment