চীনের একদল গবেষকের উদ্ভাবিত নতুন প্রজন্মের একটি পারমাণবিক ঘড়ি বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অসাধারণ নির্ভুলতার এই ঘড়ি ভবিষ্যতে সময় পরিমাপের মৌলিক একক ‘সেকেন্ড’-এর সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। অত্যাধুনিক এই যন্ত্রটির নাম স্ট্রনশিয়াম অপটিক্যাল ল্যাটিস ক্লক, যা সময় গণনায় অভূতপূর্ব সূক্ষ্মতা প্রদর্শন করছে।
গবেষকদের দাবি, এই ঘড়িটি দশমিকের পর ১৯ ঘর পর্যন্ত সেকেন্ডের হিসাব দিতে সক্ষম। বিষয়টি সহজভাবে বোঝাতে তারা উল্লেখ করেন, যদি এই ঘড়িটি টানা ৩০ হাজার কোটি বছর চালু রাখা হয়, তবুও এটি সর্বোচ্চ এক সেকেন্ডের বেশি ভুল করবে না। এমন নির্ভুলতা অতীতে কল্পনাতীত ছিল এবং আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সেকেন্ডের সংজ্ঞা আরও উন্নত করা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকের মধ্যে এই পরিবর্তন আনার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোবে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হলো, বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অন্তত তিনটি অপটিক্যাল ক্লক থাকতে হবে, যেগুলো একই ধরনের স্পন্দন বা টিক দিতে সক্ষম এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের নির্ভুলতা ও স্থায়িত্ব প্রমাণিত হতে হবে। চীনে তৈরি এই নতুন ঘড়িটি সেই শর্ত পূরণে সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
এই ঘড়ির ব্যবহার শুধু সময় গণনায় সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা বলছেন, এটি ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান এবং পৃথিবীর অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের সূক্ষ্ম পরিবর্তন নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কিত জটিল গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
সময়ের একক সেকেন্ডের সংজ্ঞা অতীতে বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এক দিনের সময়কে ৮৬ হাজার ৪০০ ভাগে ভাগ করে তার একটি অংশকে এক সেকেন্ড হিসেবে ধরা হতো। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এটি যথেষ্ট হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিল্পক্ষেত্রে অধিক নির্ভুলতার প্রয়োজন দেখা দেয়। কারণ, পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি স্থির নয় এবং বিভিন্ন কারণে এটি সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে, যা সময়ের পরিমাপে প্রভাব ফেলে।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ১৯৬৭ সালে পারমাণবিক ঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়। তখন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সেকেন্ডকে সংজ্ঞায়িত করা হয় সিজিয়াম-১৩৩ পরমাণুর নির্দিষ্ট সংখ্যক স্পন্দনের সময় হিসেবে। সিজিয়ামভিত্তিক ঘড়ি অত্যন্ত নির্ভুল হলেও আরও উন্নত প্রযুক্তির সম্ভাবনা থেকে যায়। সেই জায়গা থেকেই স্ট্রনশিয়ামভিত্তিক অপটিক্যাল ঘড়ির উদ্ভব।
স্ট্রনশিয়াম পরমাণু দৃশ্যমান আলোক কম্পাঙ্কে স্পন্দিত হয়, যা সিজিয়ামের তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে সিজিয়াম প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০০ কোটি বার স্পন্দিত হয়, সেখানে স্ট্রনশিয়াম প্রায় ৭০০ কোয়াড্রিলিয়ন বার স্পন্দন তৈরি করতে পারে। এই বিপুল স্পন্দনকে পরিমাপ করতে সক্ষম হওয়ায় অপটিক্যাল ঘড়ি সময় গণনায় অসাধারণ নির্ভুলতা অর্জন করে।
চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক দল তাদের তৈরি স্ট্রনশিয়াম অপটিক্যাল ঘড়িকে আরও উন্নত করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে আরও দুটি স্ট্রনশিয়াম অপটিক্যাল ক্লক এবং দুটি অ্যালুমিনিয়াম আয়নভিত্তিক ঘড়িও একই ধরনের উচ্চমানের নির্ভুলতা অর্জন করেছে। ফলে সেকেন্ডের সংজ্ঞা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত এগোবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওজন ও পরিমাপবিষয়ক সাধারণ সম্মেলনে, যা প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। আগামী সম্মেলন অক্টোবরে হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে। বরং সংশ্লিষ্ট কমিটিকে ২০৩০ সালের ২৯তম সম্মেলনে নতুন সংজ্ঞা প্রস্তাব এবং তা কার্যকরের সময় নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র ইতোমধ্যে ‘মেট্রোলজিয়া’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যা বিজ্ঞানী মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।





Add comment