নিয়মিত শরীরচর্চা যে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত গবেষণা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে আরও দৃঢ় তথ্য। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ক্রীড়া ও চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত ব্যায়াম অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে ওষুধ কিংবা সাইকোথেরাপির মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দলগতভাবে এবং প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ব্যায়াম কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ফল মিলেছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ বর্তমানে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, ব্যস্ত কর্মজীবন এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপ অনেকের জীবনে হতাশা ও উৎকণ্ঠাকে স্থায়ী করে তুলছে। সাধারণত এসব সমস্যার চিকিৎসায় ওষুধ ও কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও এই পদ্ধতিগুলো কার্যকর, তবুও সবার নাগালের মধ্যে থাকে না। চিকিৎসা ব্যয়, দক্ষ থেরাপিস্টের স্বল্পতা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা অনেককে চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে। পাশাপাশি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আশঙ্কাও একটি বড় বাধা।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন গবেষণার ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গবেষকেরা পূর্ববর্তী বহু গবেষণার তথ্য একত্র করে একটি মেটা মেটা অ্যানালাইসিস পরিচালনা করেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হয় ৮১টি গবেষণা পর্যালোচনা, এক হাজারের বেশি পৃথক গবেষণা এবং প্রায় ৮০ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য। বয়সভিত্তিক প্রভাব, ব্যায়ামের ধরন, একা না দলগতভাবে করা হয়েছে কি না, প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান ছিল কি না, সময় ও তীব্রতার পার্থক্য—এসব বিষয় বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, নিয়মিত ব্যায়াম বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে সক্ষম এবং উদ্বেগ কমাতে মাঝারি মাত্রার ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এই সুফল ওষুধ বা থেরাপির সমপর্যায়ের, কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছেন দুই শ্রেণির মানুষ। প্রথমত ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ তরুণীরা। দ্বিতীয়ত সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময়ে থাকা নারীরা। নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে সময়ের অভাব, শারীরিক ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং উপযুক্ত সুযোগের অভাবে ব্যায়াম করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ এই সময়েই মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। গবেষণাটি বলছে, নিরাপদ ও সহজলভ্য ব্যায়াম কর্মসূচি নিশ্চিত করা গেলে এই গোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের উন্নতি সম্ভব।
ব্যায়ামের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অ্যারোবিক ব্যায়াম সবচেয়ে কার্যকর। যেমন হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো ও সাঁতার। তবে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, ওয়েট লিফটিং, যোগব্যায়াম এবং ধ্যানও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চাই উপকারী।
দলগত ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ফল সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। জিম ক্লাস, দলগত হাঁটা বা দৌড়ানোর গ্রুপ, যোগা বা ফিটনেস ক্লাবের মতো পরিবেশ অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত থাকতে উৎসাহিত করে। নির্দিষ্ট সময়সূচি ও সামাজিক সংযোগ একঘেয়েমি কমায় এবং মানসিকভাবে সংযুক্ত থাকার অনুভূতি তৈরি করে, যা বিষণ্নতা কমাতে সহায়ক।
সময়ের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বিষণ্নতার ক্ষেত্রে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন ব্যায়াম করলেও উপকার পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত কষ্টকর বা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম আবশ্যক নয়। অন্যদিকে উদ্বেগ কমাতে টানা আট সপ্তাহ হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন ধীরগতির হাঁটা বা হালকা সাঁতার, বিশেষভাবে কার্যকর বলে দেখা গেছে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, কেবল ‘আরও ব্যায়াম করুন’ বলা যথেষ্ট নয়। বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা অনেক মানুষের অনুপ্রেরণা ও মানসিক শক্তি কম থাকে। তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত, তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং সহজে অংশগ্রহণযোগ্য কর্মসূচি। চিকিৎসকদেরও রোগীদের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাড়াভিত্তিক হাঁটার দল, কমিউনিটি সেন্টারে যোগব্যায়াম ক্লাস, পার্ক বা ছাদে গ্রুপ ফিটনেস সেশন এবং নতুন মায়েদের জন্য বিশেষ ব্যায়াম কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
যাঁরা ওষুধ গ্রহণ করতে অনাগ্রহী বা থেরাপির সুযোগ পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য পরিকল্পিত ও দলগত ব্যায়াম একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে। তবে মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম অনেক সময় চিকিৎসার অংশ হতে পারে, একমাত্র সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের মন খারাপ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ঘুমের সমস্যা বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়াই উচিত।







Add comment