সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদ ও জলবায়ু গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলের বরফ গলার পেছনে শুধু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিই দায়ী নয়, বরং বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা সূক্ষ্ম ধূলিকণাও বড় ভূমিকা রাখছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধূলিকণা বরফের ওপর বিশেষ ধরনের গাঢ় রঙের শেওলা জন্মাতে সহায়তা করছে, যা সূর্যের আলো শোষণ করে বরফ গলার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করে তুলছে।
কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাতাসের মাধ্যমে আশপাশের বরফমুক্ত এলাকা থেকে খনিজ ধূলিকণা গ্রিনল্যান্ডের বরফের ওপর জমা হচ্ছে। এসব ধূলিকণার মধ্যে ফসফরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা শেওলার বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রতি বর্গমিটার বরফের ওপর গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম ফসফরাস জমা হয়। এই পরিমাণ পুষ্টি বরফের ওপর শেওলার ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম, যা প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, বরফের ওপর শেওলা ছড়িয়ে পড়লে সেখানে একটি গাঢ় স্তর তৈরি হয়। এই গাঢ় আবরণ বরফের স্বাভাবিক প্রতিফলন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সাধারণত পরিষ্কার ও উজ্জ্বল বরফ সূর্যের অধিকাংশ আলো প্রতিফলিত করে দেয়, ফলে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু শেওলায় আচ্ছাদিত বরফ সূর্যের আলো শোষণ করে তাপ ধরে রাখে। এর ফলে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করে এবং গলিত পানি শেওলার জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এতে শেওলা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি একটি চক্রের মতো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
গবেষণার অংশ হিসেবে ধূলিকণার রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, এই কণাগুলো দূরবর্তী কোনো মরুভূমি অঞ্চল থেকে আসেনি। বরং গ্রিনল্যান্ডের কাছাকাছি স্থানীয় বরফমুক্ত ভূমি থেকেই এগুলো বাতাসে উঠে বরফের ওপর এসে পড়ছে। পাশাপাশি বাতাসের নমুনা বিশ্লেষণে ধূলিকণার সঙ্গে সঙ্গে শেওলার কোষের উপস্থিতিও শনাক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ, বাতাস শুধু পুষ্টি উপাদান বহন করছে না, বরং শেওলাকে নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে দিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
নাসার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার কারণে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় শূন্য দশমিক ৪ ইঞ্চি বেড়েছে। এই পরিবর্তন উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে শেওলার বিস্তারের ফলে এক একটি মৌসুমে বরফ গলার হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ধূলিকণার সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসা কালো কার্বন কণাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। দাবদাহ কিংবা বনভূমিতে আগুন লাগার ফলে সৃষ্ট এই কার্বন কণা বরফের ওপর জমে বরফকে আরও গাঢ় করে তোলে। এর ফলে সূর্যের আলো আরও বেশি শোষিত হয় এবং বরফ গলার গতি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।
এই গবেষণা গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার পেছনের জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে ধূলিদূষণ ও জীবাণু বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো যে কতটা গভীরভাবে বরফ গলার সঙ্গে জড়িত, তা এই গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে।







Add comment